

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেছেন, শুধু কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলেই বিজয় নিশ্চিত হয় না; প্রত্যেক ব্যক্তিরও নিজের আমল ও আখিরাতের সফলতার জন্য কাজ করতে হবে। দলের বিজয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন হলেও ব্যক্তির প্রকৃত বিজয় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে আয়োজিত খুলনা মহানগরীর রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক কর্মীকে নিজের আমল-আখলাক ও আখিরাতের সফলতার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুসলমানদের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু মুখে ইসলামের কথা বললে হবে না; জীবনে ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। মাওলানা মওদুদীর ‘সত্যের সাক্ষ্য’ প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, মৌখিক সাক্ষ্যের পাশাপাশি মানুষের জীবনে বাস্তব সাক্ষ্যও থাকতে হবে। কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
মুসলমানদের বর্তমান অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সংখ্যায় বিপুল হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, এর অন্যতম কারণ হলো ঈমানি শক্তি ও বাস্তব চেতনার ঘাটতি।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের উদাহরণ দিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, মদিনায় মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠার সময় মুসলমানদের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। মসজিদে আজকের মতো জাঁকজমক, দামি কার্পেট বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না। অথচ সে সময় পারস্য ও রোমের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্য মুসলমানদের ভয় করত। বর্তমানে অনেক মসজিদ আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন হলেও মুসলমানদের মধ্যে সেই ঈমানি শক্তির ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ এখন দুনিয়াবি সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কে বেশি বাড়ি করবে, কে বেশি সম্পদের মালিক হবে—এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ইসলামে সম্পদ অর্জন নিষিদ্ধ নয়; বরং সম্পদ থাকলে যাকাত ও দান-সদকা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে সম্পদ অর্জনের জন্য অবৈধ বা অন্যায় পথ বেছে নেওয়া যাবে না। প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য।
এ টি এম আজহারুল ইসলাম আরও বলেন, দলের বিজয় মানেই ব্যক্তির বিজয় নয়। কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে ভোট চুরি বা অনৈতিক পদ্ধতিতে দলকে ক্ষমতায় আনলেও তাতে তার ব্যক্তিগত মুক্তি হবে না। একজন চোর কোনো ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা চুরি করে তা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করলেও তার চুরি বৈধ হয়ে যায় না। একইভাবে দলের স্বার্থে অন্যায় করলে সেই অন্যায়ের দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ করা। পাশাপাশি প্রত্যেক কর্মীকে নিজের আখিরাতের সফলতার জন্যও কাজ করতে হবে। কারণ, আল্লাহর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে হবে।
সূরা আস-সফের আয়াতের প্রসঙ্গ তুলে এ টি এম আজহার বলেন, আল্লাহ এমন একটি ব্যবসার কথা বলেছেন, যা মানুষকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। সেই ব্যবসার মূলধন হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম। এ ক্ষেত্রে শুধু অর্থ নয়, মানুষের মেধা, সময়, শক্তি, যোগ্যতা ও সামর্থ্যও আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিষয় রয়েছে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগকে ‘রিফাইন’ করে নতুন রূপে রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তি এবং দিল্লির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষে সহজে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক কৃতিত্ব নয় উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এটি আল্লাহর রহমত এবং ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ফল। দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ বছরের রাজনৈতিক অন্ধকারের পর মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল। গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, বৈষম্য, দলীয়করণ ও অর্থপাচারমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা। তাঁর ভাষ্য, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকা কয়েকজনের অতীতে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে অতীতের বিএনপি সরকারের সময়ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব ছিল বলেও মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর সেই পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একসময় শিবিরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ক্যাম্পাসে বাধাগ্রস্ত করা হলেও বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয়কে তিনি ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রতি তরুণদের সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাম, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ—যে পরিচয়েই রাজনীতি করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আদর্শিক অবস্থানই একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী তার আদর্শের রাজনীতি চালিয়ে যাবে।
খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপির সঞ্চালনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি এবং সহকারী পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন এবং বাংলাদেশ ইসলাম
মন্তব্য করুন