• বৃহঃ. জুলা ১৬, ২০২৬

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ: শুধু বৃষ্টি নয়, জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ

ByShirso aparadh

জুলা ১৫, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি বছরের পরীক্ষা আয়োজন, প্রশ্নপত্র, রুটিন এবং দুর্যোগকালীন সিদ্ধান্তকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সন্ধ্যার পরও অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান করেন। পরে কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত করলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থেকে পরদিন পরীক্ষা শেষে আবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে লং মার্চের ঘোষণা দেন তারা।

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারও নড়েচড়ে বসে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের পরীক্ষা বাতিল করে পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা দেওয়া হলেও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।

অভিন্ন প্রশ্নপত্র নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ

চলতি বছর প্রথমবারের মতো দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আগে প্রতিটি বোর্ড নিজস্ব প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিত। সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা আগের বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নিত।

কিন্তু পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, তারা পর্যাপ্ত সময় পাননি নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ফলে প্রস্তুতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষকদেরও একটি অংশ মনে করছেন, এত বড় পরিবর্তন বাস্তবায়নের আগে অন্তত এক বছর সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল। শেষ মুহূর্তে নিয়ম পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে অস্থির করে তুলেছে।

পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন নিয়ে চরম হতাশা

বিজ্ঞান বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি পদার্থবিজ্ঞান। এই বিষয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে দুটি প্রশ্নে ত্রুটি থাকার অভিযোগ ওঠে।

পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য, ভুল প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। ফলে যেসব প্রশ্নের উত্তর তারা ভালোভাবে দিতে পারতেন, সেগুলোও শেষ করতে পারেননি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে উচ্চ নম্বর প্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন।

বাংলা ও আইসিটির প্রশ্নও বিতর্কে

শুধু পদার্থবিজ্ঞান নয়, বাংলা প্রথমপত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের প্রশ্ন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক পরীক্ষার্থী।

তাদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্রের মান আগের বছরের তুলনায় বেশি কঠিন হয়েছে। একই প্রশ্নপত্রে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রস্তুতির পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।

রুটিনে বিরতি কম, বাড়তি চাপ

চলতি বছরের পরীক্ষার সময়সূচি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মাঝখানে মাত্র একদিন বিরতি রাখা হয়েছে। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারও পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

পরীক্ষার্থীরা বলছেন, ধারাবাহিক পরীক্ষার কারণে পুনরাবৃত্তির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

দুর্যোগের মধ্যেও পরীক্ষা, বাড়ে ক্ষোভ

টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় অনেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানীর শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় পানিতে হেঁটে কিংবা বিকল্প উপায়ে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাস্তবতা বিবেচনায় আরও নমনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হতো না।

মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি

পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, ওই মন্তব্য তাদের প্রতি অসম্মানজনক ছিল এবং আগে থেকেই থাকা ক্ষোভ আরও তীব্র করে তোলে।

অভিভাবক প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে সহানুভূতিশীল অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

শিক্ষাবিদদের পরামর্শ

শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করছে।

তাদের পরামর্শ, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন প্রণয়ন ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি নতুন নিয়ম কার্যকর করার আগে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights