শেখ ফরিদ উদ্দিন :
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতার বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার “আঞ্চলিক বৈষম্য” সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মোস্তাক মিয়া। সম্প্রতি একটি দলীয় অনুষ্ঠানে দেওয়া তার এই বক্তব্য এবং এর পর তৈরি হওয়া নানা প্রতিক্রিয়া নিয়ে বর্তমানে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
অভিযোগের তির বর্তমান এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (মুরাদনগর) এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর (দেবিদ্বার) দিকে।
মোস্তাক মিয়ার মূল অভিযোগ
কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া গণমাধ্যমকে জানান, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপি নেতাকর্মীসহ দেশের আপামর ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে কুমিল্লায় বড় ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন সময়ে আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহ জেলা পরিষদের মাধ্যমে কেবল তাদের নিজস্ব দুটি উপজেলা (মুরাদনগর ও দেবিদ্বার)-এর জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করিয়ে নেন। এর ফলে জেলার বাকি ১২টি উপজেলা চরম বৈষম্য ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকেও তারা নিজেদের এলাকার নামে আরও বড় বড় ফান্ডের অর্থ এনেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ফান্ডের সঠিক ব্যবহার নিয়ে জানতে চাওয়া হলে মোস্তাক মিয়া বলেন,
”আমার কথা সেটা নয়। আমি বলতে চেয়েছি—যারা মুখে এত সংস্কারের কথা বলেন, তারা নিজেরাই অন্য উপজেলার মানুষের সাথে কত বড় বৈষম্য করে রেখেছেন। আর এই বিশাল অঙ্কের তহবিলের সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণই হিসাব বুঝে নেবে।”
আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহর প্রতিক্রিয়া
এই অভিযোগের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে জানান, এই ২৫ কোটি টাকা জেলা পরিষদের নিজস্ব কোনো ফান্ড নয়। এটি সরকারের এডিবি (ADP) ফান্ড থেকে তাদের এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকে মঞ্জুর করানো হয়েছিল। একই সাথে তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসকের এই বক্তব্যকে ‘জ্ঞানের অভাব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে, অভিযোগটি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে আসার পরপরই এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি অভিযোগকারী মোস্তাক মিয়ার সাথে মোবাইল ফোনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যার অডিও এবং বিবরণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। মোস্তাক মিয়ার দাবি, এই ঘটনার পর এনসিপির অনেক নেতাকর্মী তাকে নানাভাবে গালিগালাজ ও হেনস্তা করেছেন।
সংবাদ বিশ্লেষকদের মতামত
এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার খোরাক হিসেবে দেখছেন সংবাদ বিশ্লেষকগণ। বিবিসি-সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে মোস্তাক মিয়ার সাক্ষাৎকার এবং অভিযুক্তদের ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন হয়েছিল, সেই আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেই ফান্ডের আঞ্চলিক সুষম বণ্টনে ব্যর্থতার এই অভিযোগ নতুন এক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
