• মে ১৮, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

“খেলার মাঠ বন্ধক, বইয়ের বদলে ধান—মাদারগঞ্জে শিক্ষাব্যবস্থার লজ্জাজনক চিত্র”

Byadmin

এপ্রিল ২২, ২০২৬

ওয়াজেদ নয়ন, জামালপুর :
জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার ৫নং জোড়খালী ইউনিয়নের ১১১ নং রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থার এক চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা স্থানীয়ভাবে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। খাতা-কলমে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা। অধিকাংশ ক্লাসে নেই নিয়মিত পাঠদান, নেই শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ—যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—তা বন্ধক দিয়ে সেখানে ইরি ধানের আবাদ করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের মোট ৫২ শতক জমির মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশে রয়েছে ভবন ও অবকাঠামো, আর অবশিষ্ট জমির বড় একটি অংশ বর্তমানে কৃষিকাজের আওতায়।

এ বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, জমিটি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মিজানুর রহমান ও বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লায়লা মুস্তারির সংশ্লিষ্টতায় বন্ধক দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির জ্ঞাতসারেই হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধান শিক্ষক লায়লা মুস্তারি এ বিষয়ে আংশিক স্বীকারোক্তি দিয়ে জানান, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।” তবে মাঠ বন্ধক দেওয়ার দায় তিনি স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপান। এ ঘটনায় উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মোস্তাফিজুর রহমানের নামও আলোচনায় এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে রয়েছে পরস্পরবিরোধিতা, যা পুরো ঘটনাকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া অডিও রেকর্ড ও কথোপকথনে জানা যায়, জমিদাতা মিজানুর রহমান ও তার স্ত্রী, প্রধান শিক্ষক লায়লা মুস্তারি মিলে পাশের এক ব্যক্তির কাছে বিদ্যালয়ের জমি বন্ধক দিয়েছেন, যা এখনও বহাল রয়েছে। এতে সরকারি সম্পদের অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও শিক্ষাদান কার্যক্রম প্রায় অচল। ক্লাস চলাকালীন সময়েও কয়েকজন শিক্ষককে আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কেউ কেউ সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত সরে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না গিয়ে সময় কাটাচ্ছে মোবাইল গেমে—বিশেষ করে ‘ফ্রি ফায়ার’-এ আসক্ত হয়ে পড়ছে। কেউ খেলাধুলার পরিবর্তে ক্যারাম বা অন্য কাজে সময় ব্যয় করছে, আবার কেউ কেউ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে, আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নেই কোনো কার্যকর তদারকি।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে সভাপতি ছিলেন মিজানুর রহমান। বর্তমানে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। কমিটির সদস্য হিসেবে আছেন মিজানুর রহমান এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি আব্দুল কাইয়ুম। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন লায়লা মুস্তারি।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি বিদ্যালয় যেখানে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার কথা, সেখানে যদি খেলার মাঠ বন্ধক দিয়ে ধান চাষ করা হয়, তবে তা শুধু অনিয়ম নয়—এটি একটি গুরুতর সামাজিক অপরাধ। সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights