নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া |
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক পীরকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। ঘটনাটি এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শামীম রেজা (৪৫), যিনি জাহাঙ্গীর নামেও পরিচিত, ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
কীভাবে ঘটল ঘটনা
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ধর্মীয় অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। শুক্রবার থেকেই বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরদিন সকালে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে তারা মিছিল নিয়ে শামীম রেজার দরবারের দিকে অগ্রসর হয় এবং একপর্যায়ে সেখানে হামলা চালায়।
হামলা ও হতাহতের ঘটনা
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা দরবারে ঢুকে শামীম রেজাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এবং মারধর করে গুরুতর আহত করে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
হামলার সময় দরবারের অন্তত দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। পাশাপাশি কয়েকটি স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে অন্তত পাঁচ থেকে সাতজন আহত হন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রশাসনের বক্তব্য
জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরুতে বেগ পেতে হয়। পরে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পুলিশ জানায়, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম রেজা আগে ঢাকায় চাকরি করতেন। পরে নিজ এলাকায় ফিরে সুফি ধারার অনুসারী হিসেবে একটি দরবার প্রতিষ্ঠা করেন। অতীতে একটি ভিডিওকে ঘিরে তার বিরুদ্ধে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল বলেও জানা যায়।
আইন নিজের হাতে নয়
এলাকার সংসদ সদস্য বলেছেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তার বিচার আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করার প্রবণতা এসব সহিংসতার অন্যতম কারণ।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল—গুজব বা অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনতার সহিংসতা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
