
নির্বাচনে জয়লাভ করলে রাজপথের আন্দোলনকারী সব শরিক দলকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হলেও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে গঠিত সরকারে শরিক দলগুলো থেকে মাত্র তিনজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে শরিকদের একটি বড় অংশের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য—তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার আসলে কেবলই একটি ‘বিএনপি সরকার’।
২০২২ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনে স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথম এই জাতীয় সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা একসঙ্গে আন্দোলন করছে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্বিশেষে তাদের সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগপর্যন্ত দলটির শীর্ষ নেতারা নিয়মিত এই প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে আসছিলেন। এমনকি নির্বাচনের ঠিক আগে, ৪ জানুয়ারি সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছিলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে এককভাবে নয়, বরং আন্দোলনকারী শরিকদের নিয়েই জাতীয় সরকার গঠন করা হবে।
নির্বাচনী আসন সমঝোতা ও ফলাফল
নির্বাচনে জোটের শরিকদের জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। এর মধ্যে ৫টি দল নিজেদের দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করে ৮টি আসনে। দলগুলো হলো:
- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (৪টি আসন)
- গণসংহতি আন্দোলন (১টি আসন)
- বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (১টি আসন)
- বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (১টি আসন)
- গণ অধিকার পরিষদ (১টি আসন)
বাকি ৭টি আসনে শরিক দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের দল ভেঙে বা সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তবে শরিকদের ছেড়ে দেওয়া এই ১৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫টি আসনে জয় আসে। বাকি আসনগুলোতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি জোট।
নতুন সরকারে শরিকদের অবস্থান
বিজয়ীদের মধ্য থেকে মাত্র ৩ জন নেতাকে মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জায়গা দেওয়া হয়েছে: ১. জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি আন্দোলন) – পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ২. নুরুল হক নূর (গণ অধিকার পরিষদ) – প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ৩. ববি হাজ্জাজ (এনডিএম, ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী) – প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
বিজয়ীদের তালিকায় থাকা সত্ত্বেও সাবেক জোট শরিক আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং শাহাদাত হোসেন সেলিম সরকারে কোনো জায়গা পাননি। বিশেষ করে শাহাদাত হোসেন সেলিম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার আলোচনায় বিএনপির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়নি।
শরিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া: “ভোটের আগে ফস, পরে আর নাই”
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকারের যাত্রা শুরু হয়। ইতিমধ্যেই সরকারের ১০০ দিনের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। জাতীয় সরকার গঠন না হওয়ায় শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
“কথায় আছে না, কোকাকোলা ভোটের আগে ফস করে, ভোটের পরে করে না।” — মাহমুদুর রহমান মান্না, সভাপতি, নাগরিক ঐক্য
গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি তাদের দেওয়া কথা রাখেনি। দু-একজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হলেও একে কোনোভাবেই জোটের সরকার বলা যায় না। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি একক দলীয় বিএনপি সরকার।
একই জোটের আরেক নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপি নিজেই তাদের ইশতেহারে ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতি গঠনের কথা বলেছিল। কিন্তু সরকারে যদি সবার অন্তর্ভুক্তি বা ‘রেইনবো সরকার’ না থাকে, তবে রেইনবো নেশন কীভাবে সম্ভব? এখন জাতীয় সরকার নিয়ে কোনো চিকিৎসাই নেই।
ভিন্ন সুর রাশেদ খানের কণ্ঠে
সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হওয়া গণ অধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান অবশ্য এখনো আশাবাদী। ৩ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ধাপে ধাপে তাঁদের রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের ৩১ দফা এবং জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ক্ষুব্ধ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম
সবচেয়ে বেশি ৪টি আসন পেয়েও একটিতেও জয়ী হতে পারেনি ধর্মভিত্তিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। এই আসনগুলোতে বিএনপির বিদ্রোহী, জামায়াত এবং অন্য প্রার্থীরা জয়ী হন। এই পরাজয়ের পর দলটির সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “বিএনপি আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তার খেসারত তাদের ভুগতে হবে।” তিনি দাবি করেন, জমিয়তের ভূমিকার কারণেই জামায়াতের ক্ষমতা আসা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।
বিএনপির বক্তব্য
শরিকদের মাঝে এই দূরত্ব ও হতাশা তৈরি হওয়াকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিএনপির ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। তবে বিএনপির জ্যোতিষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসার জন্য চীনে থাকা এই নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো একে একে বাস্তবায়ন করছেন এবং সময়ের ব্যবধানে জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতিও অবশ্যই পূরণ করা হবে।
