• শনি. আগ ২২, ২০২৬

Daily Shirso Aparadh

ঘটনার অন্তরালের সত্য উদ্‌ঘাটনে

ছাত্র রাজনীতি থেকে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক: আবদুল লতিফ জনির রাজনৈতিক পথচলা

ByShirso Aparadh

আগ ২২, ২০২৬

একরামুল হক
২২ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ও পরিচিত সংগঠক আবদুল লতিফ জনি। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ ও সাংগঠনিক নানা দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি ধাপে ধাপে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার বারাহী গোবিন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী আবদুল লতিফ জনির রাজনৈতিক জীবনের সূচনা মূলত ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। শিক্ষা, সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—তিন ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকার কারণে ছাত্রজীবনেই তিনি সহকর্মী ও নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

শিক্ষাজীবন ও রাজনীতিতে প্রবেশ

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর আবদুল লতিফ জনি চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নানা টানাপোড়েন ও আন্দোলনে উত্তাল। ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল।

ছাত্রদলের একজন কর্মী হিসেবে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করেন। সংগঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সূচনা হয়।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রদলের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা আরও বাড়ে। একই সঙ্গে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ

আবদুল লতিফ জনির রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৮৭ সালের ১৩ নভেম্বর। ওই দিন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের একটি মিছিল থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে দীর্ঘ পাঁচ মাস ১৭ দিন কারাভোগ করতে হয়।

কারাবন্দি থাকার সময় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতি দৃঢ়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

কারাভোগের পরও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং সংগঠনের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে থাকেন।

ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান আবদুল লতিফ জনি।

১৯৮৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও তাঁর দায়িত্বের পরিধি বাড়ে। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির মূলধারায়

ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতার পর আবদুল লতিফ জনি বিএনপির মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকে।

বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে দলের কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।

দলের প্রতি দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান।

বিএনপির দপ্তর শাখায় দায়িত্ব

বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দলীয় বিবৃতি, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, রাজনৈতিক কর্মসূচির তথ্য প্রচার, গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়ে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে দপ্তর শাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সহ-দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আবদুল লতিফ জনি এসব কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় কর্মসূচি ও রাজনৈতিক বক্তব্য গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক তথ্যের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রীয় দপ্তরের কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি ভূমিকা রাখেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে আসে।

জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে দায়িত্ব

দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় আবদুল লতিফ জনি পরবর্তীতে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দলের বৃহত্তর সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত হয়। দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনীতি ও কেন্দ্রীয় দপ্তরের অভিজ্ঞতা তাঁকে দলীয় কর্মকাণ্ডে একজন অভিজ্ঞ সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা

আবদুল লতিফ জনির রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। ছাত্রজীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবরণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েও তিনি দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের আন্দোলন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।

দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির রাজনীতিতে তিনি একজন পরীক্ষিত সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

সাংবাদিকতায়ও নেতৃত্ব

রাজনীতির পাশাপাশি গণমাধ্যমের সঙ্গেও আবদুল লতিফ জনির দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক শীর্ষ অপরাধ-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় কার্যক্রম, সংবাদ পরিবেশন, সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং সামগ্রিক পেশাগত কার্যক্রমে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি গণমাধ্যমে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে জাতীয় রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম—দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয় রাখছে। তিনি সংবাদপত্রটির সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয় মান ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি

চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পথচলার সূচনা, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবরণ পেরিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এসে বিস্তৃত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৮৮ সালে সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সভাপতি, পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আবদুল লতিফ জনি। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা মূলত ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসার একটি দীর্ঘ অধ্যায়।

ছাত্ররাজনীতির একজন কর্মী হিসেবে যাত্রা শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ ও সাংগঠনিক দায়িত্বের নানা ধাপ পেরিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছানো আবদুল লতিফ জনির রাজনৈতিক জীবন তাই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights