• মে ২২, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

একীভূতকরণের দুই বছর: আমানতকারীদের কান্না আর কত দিন?

ByShirso aparadh

মে ২২, ২০২৬
CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), quality = 82

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের পর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই বছর। কিন্তু গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমার বদলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। জীবনের শেষ সম্বল, পেনশনের টাকা কিংবা প্রবাসের কষ্টার্জিত আয় ব্যাংকে রেখে এখন হাজার হাজার আমানতকারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিজের জমানো টাকা থাকার পরও অনেকে চিকিৎসা করাতে পারছেন না, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন না, এমনকি সংসার চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

​সংকটের মূলে বিপুল খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট

​কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক:

  • গ্রাহক সংখ্যা: প্রায় ৭৫ লাখ
  • মোট আমানত: ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা
  • মোট ঋণ: প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা (যার সিংহভাগই এখন খেলাপি)

​এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণেই ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে। তবে ব্যাংকটির মাসিক পরিচালনা ও বেতন-ভাতায় খরচ হচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের নিজস্ব আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শুরুতেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে এই নতুন প্রতিষ্ঠান।

​’হেয়ার কাট’ নীতি ও গ্রাহকদের ক্ষোভ

​আমানতকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতি। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমানতের বিপরীতে গ্রাহকদের মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া হবে—অথচ অনেকেই ১২ থেকে ১৪ শতাংশ মুনাফার আশায় টাকা রেখেছিলেন।

​ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত চরম বৈষম্যমূলক। কারণ যারা আগেই টাকা তুলে নিয়েছেন তারা বেঁচে গেছেন, আর যারা ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে টাকা তোলেননি, তারাই এখন ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

​”পরিচালকদের লুটপাট ও ব্যাংকের লোকসানের দায় সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো কোনোভাবেই আর্থিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”

মুস্তফা কে মুজেরী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

​নেতৃত্ব শূন্যতা ও আইনি জটিলতা

​একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন একাধিক উদ্যোক্তা। এর মধ্যেই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলেও নানা জটিলতায় নিয়োগপ্রাপ্ত এমডি পদত্যাগ করেছেন। এই অস্থিরতার মাঝেই হঠাৎ করে চেয়ারম্যানও পদত্যাগ করায় ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

​কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পদক্ষেপ

​বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমানতকারীদের জন্য নতুন কোনো বিশেষ স্কিম আপাতত নেই। তবে সরকার খুব দ্রুতই অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করবে।

​উদ্বেগের মাঝেও কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিলের বিশেষ স্কিমের আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ আমানতকারীকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

​বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি

​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু এই পাঁচটি ব্যাংকের নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি করছে। দ্রুত কোনো টেকসই সমাধান না এলে দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ ছোট আমানতকারীদের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights