• সোম. জুলা ২৭, ২০২৬

ক্রাচে ভর করেই সংবাদ পৌঁছে দেন পাঠকের দোরগোড়ায়, ৪১ বছর ধরে পত্রিকা বিলিতে অবিচল আবুল কাশেম

ByShirso aparadh

জুলা ২৬, ২০২৬

সাখাওয়াত হোসেন মামুন, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) :

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার প্রবীণ সংবাদপত্র বিক্রেতা মো. আবুল কাশেম। বয়স ৫৩ বছর। দুর্ঘটনায় পায়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরও থেমে থাকেননি তিনি। ক্রাচে ভর করেই প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছেন পাঠকের দোরগোড়ায়, হাতে তুলে দিচ্ছেন দৈনিক পত্রিকা। জীবিকার তাগিদে শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে তার এই সংগ্রাম অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার।

রবিবার (২৬ জুলাই) দুপুরে পূর্বধলা বাজারের স্টেশন রোডের বিএনপির মোড় এলাকায় এক গ্রাহকের দোকানে ক্রাচে ভর করে পত্রিকা পৌঁছে দিতে দেখা যায় আবুল কাশেমকে। দীর্ঘদিনের পরিচিত কণ্ঠে এখনও তিনি বলেন, “আজকে গরম খবর আছে”, এরপরই পাঠকের হাতে তুলে দেন সংবাদপত্র।

জানা যায়, ১৯৮৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে সংবাদপত্র বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেই থেকে টানা ৪১ বছর ধরে পূর্বধলা উপজেলায় সংবাদপত্র বিলি করে আসছেন।

আবুল কাশেম জানান, চলতি বছরের ১৬ মার্চ নেত্রকোনা থেকে সিএনজিযোগে পূর্বধলায় ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। পা ও শরীরে আঘাত পেয়ে প্রায় চার মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয় এবং দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, “আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস পত্রিকা বিক্রি। তাই পুরোপুরি সুস্থ না হলেও বাধ্য হয়ে ক্রাচে ভর করে আবার কাজে ফিরেছি।”

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সংবাদপত্র বিলি করেন তিনি। এরপর বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছ থেকে বিক্রির টাকা সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন এ কাজে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ চলতে হয়।

তিনি বলেন, “কষ্ট তো হয়ই। কিন্তু পেটের দায়ে কাজ করতেই হয়। যতদিন শরীর সাড়া দেবে, ততদিন এই পেশায় থাকব।”

ব্যক্তিগত জীবনে আবুল কাশেম দুই ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জনক। তার তিন সন্তানই বর্তমানে লেখাপড়া করছে।

সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান সংকট নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যমের প্রসারের কারণে ছাপা পত্রিকার পাঠক অনেক কমে গেছে। আগে প্রতিদিন অনেক বেশি পত্রিকা বিক্রি হলেও এখন মাত্র ৮০ থেকে ১০০ কপি বিক্রি হয়। কমিশনে পত্রিকা আনতে হয়, বিক্রি না হলে লোকসান গুনতে হয়। বর্তমান আয়ে সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবুল কাশেমের ভাষায়, “একসময় মানুষ পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করত। এখন অনেক সময় অনুরোধ করেও পত্রিকা দিতে হয়। এই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষগুলো খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমরা প্রতিদিন মানুষের হাতে সংবাদপত্র পৌঁছে দিই। তাই আমাদের মতো সংবাদপত্র বিক্রেতাদের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এখনই দেখুন

Verified by MonsterInsights