• রবি. জুন ২৮, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

৪৭ ট্রফির মহাকাব্য: মেসি কি আসলেই অন্য গ্রহের ফুটবলার?

ByShirso aparadh

জুন ২৭, ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক | প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২৬

ফুটবল বিশ্বে তাকে ডাকা হয় ‘দ্য অ্যাটমিক ফ্লি’ বা পারমাণবিক মাছি। কিন্তু সবুজ ঘাসের বুকে তার কীর্তিগুলো যেন মহাজাগতিক। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা যখন লিওনেল মেসি আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল বোদ্ধারা একবাক্যে বলেছিলেন— ফুটবল খেলাটা এবার ‘সম্পূর্ণ’ হলো। তবে গল্পটা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালেও এসেও থামেনি তার পায়ের জাদু। প্রতিনিয়ত মাঠে তিনি যা করে দেখাচ্ছেন, তাতে ফুটবল পাড়ায় নতুন করে সেই পুরনো বিতর্কটাই চাঙ্গা হচ্ছে— মেসি কি আসলেই আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ, নাকি অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা ভিনদেশী এলিয়েন!


৪৭ শিরোপার এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড

ফুটবল ইতিহাসে ট্রফি জয়ের দিক থেকে লিওনেল মেসি এখন সবার শীর্ষে। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে তার ঝুলিতে রয়েছে রেকর্ড ৪৭টি শিরোপা।

  • বার্সেলোনা (১৭ মৌসুম): লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ জিতেছেন রেকর্ড ৩৪টি শিরোপা।
  • পিএসজি: ফরাসি ক্লাবটির হয়ে জিতেছেন টানা দুটি লিগ ওয়ান শিরোপা।
  • ইন্টার মিয়ামি: আমেরিকার ক্লাবটিতে যোগ দিয়েই এনে দিয়েছেন তাদের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ ও অন্যান্য ট্রফি।

শুধু ক্লাব ফুটবলই নয়, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতেও তার অর্জন আকাশচুম্বী। ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিকের স্বর্ণপদক, ফাইনালিসিমা এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা জয়ের পর এসেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কাতার বিশ্বকাপে ৩৫ বছর বয়সে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে এনে দেন তাদের ইতিহাসের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। ব্যক্তিগত অর্জনেও তিনি অনন্য, রেকর্ড ৮ বার জিতেছেন ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্যালন ডি’অর’।


ফুটবল ছাড়িয়ে যখন ‘অলরাউন্ডার’ মেসি

মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ড্রিবলার বলা হয়। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বোকা বানানোর সময় তার শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়া এবং নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ এক অদ্ভুত শিল্প। তবে তিনি শুধু গোলদাতাই নন, বানিয়েছেন গোল করানোর রেকর্ডও। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট (গোল করানো) করার রেকর্ডটি তারই। বার্সেলোনা এবং ইন্টার মিয়ামির হয়ে তার গোল করার গড় প্রায় প্রতি ম্যাচে একটি করে!


কিংবদন্তিদের চোখে মেসি: ‘তাকে থামাতে মেশিনগান লাগবে’

মেসির খেলা দেখে ফুটবল দুনিয়ার কিংবদন্তিরা বারবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন:

“একসময় বলা হতো আমাকে থামাতে পিস্তল লাগবে। আজ মেসিকে থামাতে মেশিনগান দরকার।” — হ্রিস্টো স্টইকভ (ক্রোয়েশিয়ান কিংবদন্তি)

“মেসির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর আমি তাকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম। নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, সে আমাদের মতো মানুষ কি না।” — জিয়ানলুইজি বুফন (ইতালিয়ান কিংবদন্তি)

“তার সঙ্গে বহুবার খেলেছি, তবুও সে যা করে তা আমি এখনও বুঝতে পারি না। সে মানুষ না, এলিয়েন। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গর্ব হলো তার সঙ্গে খেলতে পারা।” — অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া (আর্জেন্টাইন তারকা)

“আমি যখন ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকাব, সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি হবে ছোট্ট মেসিকে বেড়ে উঠতে দেখা। সে অবসর নিলে পুরো ফুটবল বিশ্বেরই ১০ নম্বর জার্সিটা চিরতরে অবসর দেওয়া উচিত।” — রোনালদিনহো (ব্রাজিলিয়ান জাদুকর)


ন্যাপকিন পেপার থেকে লিওনেল রিচি: কিছু অজানা গল্প

  • নামের পেছনের ইতিহাস: বিখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী লিওনেল রিচির নামানুসারে মেসির নাম রাখা হয়েছিল ‘লিওনেল’। মেসির মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি রিচির গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসতেন। পরবর্তীতে মিয়ামিতে এই দুই লিওনেলের দেখাও হয়েছিল।
  • উচ্চতার লড়াই: ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের মারাত্মক ঘাটতি ছিল মেসির। ১৩ বছর বয়সে যখন বার্সেলোনায় ট্রায়াল দিতে যান, তখন তার উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। জেরার্ড পিকে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এই পুঁচকে ছেলেকে বাদ দেওয়া হবে; কিন্তু বল পায়ে ছোঁয়ার পর আমাদের সব ভুল ভেঙে যায়।”
  • ন্যাপকিন পেপারের চুক্তি: মেসির চিকিৎসার পেছনে বিশাল খরচের কারণে বার্সেলোনা প্রথমে দ্বিধায় ছিল। তবে ক্লাবের তৎকালীন টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর চার্লি রেক্সাচ দেরি করতে চাননি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাতের কাছে থাকা একটি রেস্টুরেন্টের ন্যাপকিন পেপারের ওপর লিখেই মেসির সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তিটি সেরে ফেলেছিলেন।

বিশ্বকাপের পাতায় মেসির যত অতিমানবীয় কীর্তি

বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির পরিসংখ্যান চোখ কপালে তোলার মতো:

  • ছয় বিশ্বকাপের নায়ক: ইতিহাসের মাত্র ছয়জন খেলোয়াড়ের একজন হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য কীর্তি তার।
  • ম্যাচ ও মিনিটের রাজা: বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৬টি ম্যাচ এবং সবচেয়ে বেশি ২,৩১৪ মিনিট খেলার বিশ্বরেকর্ড মেসির।
  • সব ধাপে গোল: এক বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল— প্রতিটি ধাপে গোল করা ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার তিনি।
  • তিন দশকের গোল: কিশোর বয়স, বিশের কোঠা এবং ত্রিশের কোঠা— তিনটি ভিন্ন দশকেই বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড রয়েছে তার।
  • সেরার সেরা: বিশ্বকাপে রেকর্ড ২ বার ‘গোল্ডেন বল’ এবং রেকর্ড ১১ বার ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নতুন স্বপ্ন

টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড ফুটবল ইতিহাসে বিরল (৬২ বছর ধরে কোনো দল তা পারেনি)। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেও আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বিন্দুমাত্র কমেনি। মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি এখনও অপ্রতিরোধ্য। গোলপোস্টে বিশ্বস্ত ‘দিবু’ মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো ডি পলদের নিয়ে দলটির ভারসাম্য চমৎকার।

অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও আক্রমণভাগে হুলিয়ান আলভারেজ ও লওতারো মার্টিনেজের সঙ্গে আছেন স্বয়ং লিওনেল মেসি। এর পাশাপাশি থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাজ এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো তরুণদের উত্থান আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের এক নতুন ও শক্তিশালী আশার আলো দেখাচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এখনই দেখুন

Verified by MonsterInsights