• শনি. জুলা ১১, ২০২৬

রূপগঞ্জে সরকারি খাল ভরাটের অভিযোগে ৭ গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি

ByShirso aparadh

জুলা ১১, ২০২৬

মো. ওসমান গনি, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :

সরকারি পানি নিষ্কাশনের খাল ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার অন্তত সাতটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। রাস্তা, ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ অর্ধশতাধিক মানুষ ঠান্ডাজনিত ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইস্টউড সিটি নামের একটি আবাসন প্রকল্প সরকারি খালগুলো বালু দিয়ে ভরাট করায় স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কাঞ্চন পৌরসভার হাটাবো টেকপাড়া, কালাদি, নলপাথর, নড়াবো, কোশাব, আইতলা ও ডুলুরদিয়া গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়িতে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গ্রামের কৃষিজমি ও বসতবাড়ির পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ছয়টি সরকারি খাল ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ইস্টউড সিটি প্রকল্পের বালু ভরাটের কারণে খালগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে হান্ডি মার্কেট থেকে ডেওরি বিল পর্যন্ত খাল, মুকসুর বাড়ি থেকে মগার বাড়ি পর্যন্ত চিপা খাল, কালাদি থেকে ভুলতা বড় খাল, বাড়ৈপাড়া থেকে ডুলুরদিয়া হয়ে নলপাথর খাল, ইকবালেরটেক থেকে নড়াবো খাল এবং নড়াবো থেকে নলপাথর পানি নিষ্কাশন খাল উল্লেখযোগ্য।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় ছয় বছর ধরে তারা এই জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বর্ষা এলেই মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেও সরকারি খাল উদ্ধার করতে পারেননি। উপজেলা প্রশাসন কয়েকবার অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধানে রূপ নেয়নি।

জলাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি পাকা সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে চলাচল করতে গিয়ে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ও মাদ্রাসায় যেতে পারছে না, ফলে তাদের লেখাপড়াও ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে স্থানীয় মাছচাষিরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এদিকে গোলাকান্দাইল, নাগেরবাগ, পাচাইখা, বরাবো ও পবনকুলসহ আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নলপাথর গ্রামের বাসিন্দা আজু মিয়া বলেন, “খাল ভরাট করার কারণেই আমাদের এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয়েছে। কাজে যেতে পারছি না, রাস্তায় কোমরসমান পানি। গবাদিপশু পালন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা চাই দ্রুত সরকারি খাল পুনঃখনন করা হোক।”

নড়াবো এলাকার ইমান আলী বলেন, “ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। রান্না করতে পারছি না, স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপনও সম্ভব হচ্ছে না। খাল দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হোক।”

কালাদি গ্রামের আলী হোসেন বলেন, “অল্প বৃষ্টিতেই আমাদের রাস্তা তলিয়ে যায়। এবার কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পুরো এলাকা পানির নিচে। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না। আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।”

টেকপাড়ার বাসিন্দা রাহেলা বেগম বলেন, “পাঁচ-ছয় দিন ধরে ঘরের ভেতরে পানি। ঠিকমতো রান্না করতে পারছি না, ছেলে-মেয়েরাও স্কুলে যেতে পারছে না। দ্রুত সমস্যার সমাধান চাই।”

অভিযোগের বিষয়ে ইস্টউড সিটির ল্যান্ড অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, “খালের জায়গা রেখেই বালু ভরাট করা হয়েছে।”

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. বাদল কুমার সাহা বলেন, “সম্প্রতি চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে সবাইকে ময়লা ও দূষিত পানি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

কাঞ্চন পৌর প্রশাসক মারজানুর রহমান বলেন, “জলাবদ্ধতার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। অবৈধভাবে সরকারি খাল ভরাটের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে নলপাথর, নলিটেক, নড়াবো, হাটাবো টেকপাড়া ও কালাদিসহ সাত গ্রামের মানুষ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি খাল পুনরুদ্ধার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধভাবে ভরাট হওয়া সরকারি খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশনের পথ সচল করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হাজারো পানিবন্দি মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights