• মে ১৯, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা

Byadmin

মে ১, ২০২৬

শেখ ফরিদ উদ্দিন

আজ ১ মে—মহান মে দিবস। বিশ্বব্যাপী দিনটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মে দিবসের ইতিহাস মূলত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এক রক্তঝরা সংগ্রামের কাহিনী। তবে মানবসৃষ্ট আধুনিক সমাজব্যবস্থার বহু আগেই ইসলাম শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

মে দিবসের প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তি

উনিশ শতকের মাঝামাঝি শিল্প বিপ্লবের ফলে শ্রমিকদের কাজের সময় নির্ধারিত ছিল না। প্রতিদিন ১০–১২ ঘণ্টা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে হতো, বিনিময়ে মিলত অতি সামান্য মজুরি।

শিকাগোর আন্দোলন (১৮৮৬)

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক রাজপথে নেমে আসে।

রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ

৩ মে ম্যাককরমিক রিপার কারখানার সামনে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৪ মে হে-মার্কেটে জনসভা চলাকালে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে অন্তত ১১ জন শ্রমিক নিহত ও বহু আহত হন।

বিচার ও ফাঁসি

আন্দোলন দমনে ৮ জন শ্রমিক নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর ৪ জন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

মে দিবস পালনের সূচনা

১৮৮৯ সাল: প্যারিসে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা

১৮৯০ সাল: প্রথমবার বিশ্বব্যাপী মে দিবস পালন

১৮৯১ সাল: প্রতি বছর দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত


ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা

শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে। প্রায় ১৪০০ বছর আগেই ইসলাম শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করেছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানব সমাজকে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছেন। সমাজের ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল—সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই ভারসাম্যের মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে শ্রমিকের অধিকার

১. সাম্য ও মর্যাদা:
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ধনী-দরিদ্র বিভাজন জুলুমের জন্য নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য (সূরা আজ-জুখরুফ: ৩২, সূরা আল-বাকারা: ২৫১)।

২. মজুরি নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা:
রাসূল (সা.) বলেছেন, কাজ নেওয়ার আগেই শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করতে হবে (মুসনাদে আহমদ)।

৩. ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি:
সহিহ বুখারিতে উল্লেখ আছে, “তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই।” তাদের ওপর সামর্থ্যের বাইরে কাজ চাপানো যাবে না; প্রয়োজনে মালিককে সহযোগিতা করতে হবে।

৪. সময়মতো পারিশ্রমিক প্রদান:
হাদিসে এসেছে, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো” (ইবনে মাজাহ)। এটি শ্রমিকের প্রতি ইসলামের গভীর মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ।

৫. মানবিক আচরণ:
শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, গালিগালাজ বা অবজ্ঞা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং সহানুভূতি ও ক্ষমাশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে এবং অন্যের অধিকার সম্মান করবে। মে দিবস আমাদের সেই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights