• বুধ. জুলা ১৫, ২০২৬

প্রাকৃতিক দুর্যোগে এইচএসসি পরীক্ষা: প্রাতিষ্ঠানিক অনমনীয়তা ও বিপন্ন শিক্ষার্থী-নিরাপত্তা

Byদৈনিক শীর্ষ অপরাধ

জুলা ১৪, ২০২৬

উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক

​সামাজিক চুক্তির লঙ্ঘন

​রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা অপরাধবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি’ (সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব)-এর মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে বৈরী আবহাওয়া ও ৭২ ঘণ্টার ‘আবহাওয়া ইমার্জেন্সি’র মধ্যে যেভাবে জোরপূর্বক এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, তা এই সামাজিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক অবিবেচক সিদ্ধান্ত নয়, বরং অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র কর্তৃক শিক্ষার্থীদের জীবনকে চরম কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকির (Structural Vulnerability) মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল।

​দুর্যোগের চিত্র: বাস্তবতার নিরিখে ভোগান্তির উপাত্ত

​আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির তথ্যমতে, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে গত ১৩ জুলাই পরীক্ষার ষষ্ঠ দিনে প্রায় ১৯,৫৯২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বোর্ডেই অনুপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৩,৩৪৪ জন।

  • মানবিক বিপর্যয়: হাজার হাজার শিক্ষার্থী কোমর সমান পানি এবং অবিরাম বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন।
  • ক্ষয়ক্ষতি: অনেকের প্রবেশপত্র নষ্ট হয়েছে, অনেকেই ভেজা পোশাকে দীর্ঘ সময় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
  • স্বাস্থ্যঝুঁকি: তীব্র শারীরিক ও মানসিক ট্রমার শিকার অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

​অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ (Criminological Perspective)

​এই পরিস্থিতিকে কয়েকটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা ও স্টেট ক্রাইম: দুর্যোগ জেনেও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা। ভিকটিমোলজি ও স্টেট ক্রাইম তত্ত্ব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।

২. কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence): নদীমাতৃক ও জলাবদ্ধ এলাকায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বাধ্য করা তাদের ‘Right to Life’ বা জীবনের অধিকারকে চরম অবজ্ঞা করার শামিল।

৩. জবাবদিহিতার সংকট: মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত দেউলিয়াত্ব ও নৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

​সংকট উত্তরণে জরুরি প্রস্তাবনা

​একজন তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রের প্রতি নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি:

  • পরীক্ষা স্থগিত ও পুনঃতফসিল: আবহাওয়া ইমার্জেন্সি চলাকালীন সারা দেশের পরীক্ষা অনতিবিলম্বে স্থগিত করতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তা শুরু করা অনুচিত।
  • বিকেন্দ্রীকরণ: কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে স্থানীয় দুর্যোগের মাত্রা বিবেচনা করে জেলাভিত্তিক শিক্ষা বোর্ডগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
  • শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা: যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাদের জন্য বিশেষ মূল্যায়ন বা পুনঃপরীক্ষার আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না হয়।
  • স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন: ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে শিক্ষার্থীর জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (SOP) তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

​শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। যদি পরীক্ষা পদ্ধতির কঠোরতা শিক্ষার্থীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই ব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আশা করি, শিক্ষা প্রশাসন আমলাতান্ত্রিক অহমিকা পরিহার করে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে এবং তাদের সুরক্ষায় দ্রুত প্রাজ্ঞ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

আপনার মতামত বা এই বিষয়ে অন্য কোনো তথ্য জানার থাকলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এখনই দেখুন

Verified by MonsterInsights