
প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর ক্ষমতার দানবীয় জাল ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়!
✍ সোহেল রানা
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আজ পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ঙ্কর ঘাঁটিতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত দেশের বৃহত্তম প্রকল্প বিআইডব্লিউটিপি–১ এর প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আইয়ুব আলী।
রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট, ক্ষমতার দম্ভ আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি গড়ে তুলেছেন এক দুর্নীতির সাম্রাজ্য, যা প্রশাসনের গভীরে বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস ও সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান শিখরের ভায়রা পরিচয় ব্যবহার করে অদৃশ্য প্রভাবের বলয় তৈরি করেছেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের জোরে তিনি এখনও প্রকল্প পরিচালকের পদে বহাল আছেন—এ প্রশ্ন এখন জনমনে জোরালো।
যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, তার তো এখন জেলে থাকার কথা! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তার বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
প্রকল্পের টাকা লুটে বিলাসী জীবন
প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ বাণিজ্য ও পদোন্নতিতে অনিয়ম—সবই চলছে প্রকাশ্যে। প্রশাসনের নীরবতা যেন তাকে আরও সাহস জোগাচ্ছে। সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর তিনি ভোগ করছেন বিলাসবহুল জীবন।
জনগণের করের টাকায় তৈরি হচ্ছে তার দুর্নীতির সাম্রাজ্য। প্রশ্ন উঠেছে—এই দায় নেবে কে?
আইনের শাসন কি শুধু দুর্বলদের জন্য?
রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত রাজত্ব
২০১২ থেকে ২০২৪—এই ১২ বছরে আইয়ুব আলী ও তার পরিবারের নামে শত শত কোটি টাকার অঢেল সম্পদ গড়ে উঠেছে।
ঢাকা, ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, সাভার, আশুলিয়া, কালীগঞ্জ, ভৈরব ও নিজ জেলা মাগুরায় রয়েছে বিপুল সম্পত্তি।
স্ত্রী ফারজানা নাহিদ লিজার নামে বসুন্ধরায় ৩ কাঠার প্লটে নির্মাণাধীন ৭ তলা ভবন, বারিধারা ডিওএইচএসে দুটি ফ্ল্যাট, পশ্চিম ধানমণ্ডি ও জিগাতলায় আরও একাধিক বাড়ি।
এছাড়া আশুলিয়ায় গরুর খামার, আশুগঞ্জে ৫০ শতাংশ জমিতে মুরগির খামার এবং ১০ কোটি টাকার বায়োগ্যাস প্লান্টও রয়েছে তার তত্ত্বাবধানে।
ড্রেজিং প্রকল্পে হরিলুট
বিআইডব্লিউটিপি–১ এবং অন্যান্য ড্রেজিং প্রকল্পে বিল ফাঁপানো, তেল চুরি ও কাজের ভুয়া হিসাব দেখানো নিয়মে পরিণত হয়েছে।
‘বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড’ ও ‘কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড’-এর সঙ্গে যোগসাজশে ৭০০ কোটি টাকার বিল উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানে।
এমনকি কিছু সাংবাদিককেও ‘নাব্যতা সংকটের খবর’ প্রচারের বিনিময়ে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্কে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
কোটি টাকার অপচয়
বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম–ঢাকা নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন, যেখানে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে নিম্নমানের ১১টি ড্রেজার ক্রয়ে শত কোটি টাকার অনিয়মও তার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ঘুষের রাজত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার
২০২৪ সালে ৩০০ কোটি টাকার বুড়িগঙ্গা তীর রক্ষা প্রকল্পে ঠিকাদার বাছাইয়ে ঘুষের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুতি না রাখায় তিনি হামলার শিকার হন—যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
বিদেশে সম্পদ ও অর্থপাচার
তথ্যসূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে তিনি লন্ডনে এবং ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে বাড়ি ক্রয় করেছেন।
তার দুই ছেলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছে, যেখানে তাদের নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে।
প্রতি বছর পরিবারসহ তিনি বিদেশ ভ্রমণে যান, যা তার সরকারি আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানতে চাইলে আইয়ুব আলী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন—
> “তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন।”
এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
> “আমি ওর দায় নিতে পারবো না।”
দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত প্রকৌশলী আইয়ুব আলী
আইয়ুব আলী এখন বিআইডব্লিউটিএ’র দুর্নীতির প্রতীক।
রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক ভয়ঙ্কর ‘ড্রেজিং সাম্রাজ্য’, যেখানে নীতি, ন্যায় ও জবাবদিহিতা বহু আগেই নির্বাসিত।
রাষ্ট্রের অর্থ লুটে প্রভাব ও ক্ষমতার জাল বুনে তিনি আজ প্রতিষ্ঠিত এক অঘোষিত সম্রাটে।
অনুসন্ধান চলমান…..
