এস এম শাহজালাল :
ঢাকা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল, উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া এবং আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজিরের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তে আছেন এবং পদোন্নতি পেয়েছেন সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের ভেতরে একটি প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এই প্রভাব বলয়ের কারণে করপোরেশনের প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে সাধারণ ঠিকাদাররা অংশ নিতে না পারেন এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই কাজ পেয়ে যায়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে কেন্দ্র করে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। রাজধানীর দৈনন্দিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির লজিস্টিকস খাত, গাড়ির জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন খাতে অতিরিক্ত খরচ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া লগবই ব্যবহার করে অতিরিক্ত ট্রিপ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় ধরনের অসঙ্গতির দাবি উঠেছে। কাগজে-কলমে দেখানো মাস্টাররোল ও স্থায়ী কর্মীর তালিকার সাথে বাস্তবে কর্মরত কর্মীর সংখ্যার বড় ব্যবধান রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য। উপস্থিতি রেকর্ড ও বেতন প্রদান প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার চরম ঘাটতি রয়েছে। একই সাথে ডাস্টবিন, কনটেইনার এবং বর্জ্য পরিবহন যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এবং সামগ্রিক বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমে নিয়মিত অডিট ও কঠোর তদারকি না থাকায় এই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই সিন্ডিকেট শুধু টেন্ডার বা বর্জ্য খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং উন্নয়ন প্রকল্পের বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও প্রভাব খাটাতো। কিছু ক্ষেত্রে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে, আবার কোথাও কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়া সত্ত্বেও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। মো. আহসান হাবীব ২০২০ সালের পর থেকে ডিএসসিসির অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে এসব অবকাঠামো উন্নয়ন ও সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ডিএসসিসির একটি দপ্তর আদেশে মার্কেট পরিচালনা, দোকান বরাদ্দ, টেন্ডার কার্যক্রমে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) কাজী সালেহ মুস্তানজিরকেও বহিষ্কার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজী সালেহ মুস্তানজির ও আহসান হাবীবের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল এবং তারা সমন্বিতভাবে এসব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তবে সিন্ডিকেটের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা শাস্তি পেলেও আহসান হাবীব কীভাবে পদোন্নতি পেলেন, তা নিয়ে ডিএসসিসির ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান এবং বলেন, “আপনাদের অভিযোগ দেওয়ার দরকার নেই, আপনারা আমার বাসায় চলুন।” পরবর্তীতে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে সাংবাদিকদের বিদায় দেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে অতীতে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হলেও, সাম্প্রতিক তদন্ত ও অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলমান রয়েছে।
নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিএসসিসির মতো সংবেদনশীল স্থানীয় সরকার সংস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সাথে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
