• মে ২০, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

নদী দখল, বন উজাড় ও অবৈধ নগরায়নে পরিবেশ বিপর্যয়: জাতীয় প্রেসক্লাবে আবদুল লতিফ জনির বিস্ফোরক অভিযোগ

Byadmin

এপ্রিল ২, ২০২৬

এস এম শাহজালাল:
দেশজুড়ে নদী দখল, শাখা নদী ভরাট, বনভূমি উজাড়, পাহাড় ধ্বংস এবং অবৈধ নগরায়নের ফলে বাংলাদেশ ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে জরুরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন মো. আবদুল লতিফ জনি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব-এর জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে “সোসাইটি ফর দি এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্ট”-এর পক্ষ থেকে তিনি এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন।


১৭ বছরে ‘দখল-লুটপাটে’ পরিবেশ ধ্বংসের চিত্র

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গত প্রায় ১৭ বছরে দেশে একটি “দখল-নির্ভর উন্নয়ন মডেল” গড়ে উঠেছে, যার ফলে পাহাড় কেটে ফেলা, বন উজাড় এবং নদী ভরাট করে শিল্প ও আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে।

তার ভাষায়, “বাংলাদেশের পরিবেশ আজ ভারসাম্যহীন। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা, খরা—সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়েছে। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের উর্বর কৃষিজমি, ঐতিহ্যবাহী মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিলীন হয়ে যাবে।


শীতলক্ষ্যা থেকে গোমতী: নদী হারানোর ভয়াবহ চিত্র

সংবাদ সম্মেলনে তিনি একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উদাহরণ তুলে ধরেন। তার দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শীতলক্ষ্যা নদী-এর কাঁচপুর ব্রিজ থেকে গোমতী নদী-এর দাউদকান্দি ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার অধিকাংশ শাখা নদী আজ আর দৃশ্যমান নয়।

তার মতে, “মেঘনা ছাড়া প্রায় সব শাখা নদী ভরাট করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে।”


একাধিক কোম্পানির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি কয়েকটি বড় শিল্প ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে বলেন,
বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, আমিন মোহাম্মাদ গ্রুপ, ইউনাইটেড গ্রুপ এবং এশিয়ান সিটি—এসব প্রতিষ্ঠান নদী, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট করে শিল্প ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, “নদীর উপর ব্রিজ আছে, কিন্তু নদী নেই—এটাই আজকের বাস্তবতা।”


দেশের প্রধান নদীগুলোও ঝুঁকিতে

তিনি আরও বলেন, গঙ্গা নদী, পদ্মা নদী, যমুনা নদী, মেঘনা নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা নদী, কর্ণফুলী নদী, বুড়িগঙ্গা নদী, তুরাগ নদীসহ প্রায় সব বড় নদীর শাখা নদীগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া সিলেট অঞ্চলের হাওড়-বাওড়ও দখল ও ভরাটের শিকার হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


নদী পুনরুদ্ধারে ‘১৯৫২ সালের নকশা’ প্রস্তাব

তিনি দাবি করেন, নদী, খাল-বিল ও জলাশয় ১৯৫২ সালের ভূমি নকশা অনুযায়ী পুনরুদ্ধার করতে হবে।

এছাড়া তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান-এর সময় নেওয়া নদী খনন, খাল খনন ও সেচ প্রকল্প দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সেই প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করা জরুরি।


ফারাক্কা ও টিপাইমুখ: আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ ও টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তিনি বলেন, একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে।

এ সময় তিনি আব্দুল হামিদ খান ভাসানী-এর ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তির দাবি জানান।


হাতিরঝিল মডেলে আশুলিয়া জলাধার উন্নয়নের দাবি

তিনি হাতিরঝিল প্রকল্প-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, পরিকল্পিতভাবে জলাধার উন্নয়ন করলে তা নগরের পরিবেশ ও যানজট উভয় সমস্যার সমাধান দিতে পারে।

এ প্রেক্ষিতে আশুলিয়া জলাধার দখলমুক্ত করে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান।


রাজধানীর আবাসন খাতে ‘গভীর অনিয়ম’

সংবাদ সম্মেলনে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল ও তেজগাঁও শিল্প এলাকায় গত ১৭ বছরে প্লট বরাদ্দ, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।

তিনি দাবি করেন—

  • কারা প্লট পেয়েছে তা প্রকাশ করতে হবে
  • ১০ তলার বেশি ভবনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে তা জানাতে হবে
  • রাজউকের নকশা ভেঙে নির্মিত ভবন চিহ্নিত করতে হবে
  • অবৈধ ভবন ভেঙে ফেলতে হবে

তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব

তিনি একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে—

  • বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ
  • রাজউক
  • গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ
  • প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা

অন্তর্ভুক্ত থাকবে।


সশস্ত্র বাহিনীর সম্পৃক্ততার আহ্বান

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বন ও নদী রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

তার মতে, “শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে নয়, সমন্বিত শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছাড়া পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।”


সরকারের প্রতি সরাসরি আহ্বান

তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, নৌ পরিবহন মন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।


সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে তিনি বলেন, “এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের নদ-নদী, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে—এবং এর চরম মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।”


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights