নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক শীর্ষ অপরাধ
ঢাকা, ২৯ মে ২০২৪:
জাতীয় নির্বাচনের পর এবার দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল করে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণায় পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ইভিএম বর্জন এবং প্রার্থীদের জামানত বাড়ানোর মতো একগুচ্ছ কঠোর ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে কমিশন।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম শেষে আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে পাঁচ স্তরের এই নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে সরকারের এই সময়সূচির সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। আবহাওয়াজনিত কারণে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ভোটগ্রহণ কঠিন উল্লেখ করে ইসি অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে মাঠের লড়াইয়ে নামতে চায়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন,
”সেপ্টেম্বরে তো বর্ষা থাকে। ওই সময়ে মিঠামইন, বরিশাল কিংবা ময়মনসিংহের মতো নিচু ও হাওর-উপকূলীয় অঞ্চলে নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব। তাই আমার মনে হয় নভেম্বরের আগে নির্বাচন শুরু হবে না। বছরের শেষ দিকেই ভোট মাঠে গড়াবে।”
যেসব বড় পরিবর্তন আসছে এবারের নির্বাচনে
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম:
- দলীয় প্রতীক ও ১% স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা বাতিল: এবারের নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়। কোনও দলীয় প্রার্থী বা প্রতীক থাকবে না, সবাই স্বতন্ত্র হিসেবে লড়বেন। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য পূর্বে নির্ধারিত ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিতর্কিত নিয়মটি থাকছে না।
- পোস্টার ও অনলাইন মনোনয়ন নিষিদ্ধ: পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় প্রচারণায় কোনও ধরনের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহৃত অনলাইন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থাটি এবার বাতিল করা হচ্ছে।
- থাকছে না ইভিএম ও পোস্টাল ব্যালট: এবার সম্পূর্ণ ব্যালট পেপারে ভোট হবে, কোনও ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। একই সঙ্গে দেশে বা বিদেশে থাকা ভোটারদের জন্য পোস্টাল ভোটিংয়ের ব্যবস্থাও থাকছে না।
- ফেরারি আসামিদের পথ বন্ধ: কোনও ফেরারি আসামি এবার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
- জামানত ও ব্যয় বৃদ্ধি: নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের জামানতের টাকার পরিমাণ ও নির্বাচনি ব্যয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে, যা চলতি জুন মাসের মধ্যেই বিধিমালার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
মাঠে থাকবে না সেনাবাহিনী, ভোট হবে ধাপে ধাপে
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বরাবরের মতোই সংঘাতের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। বিগত দশকের রক্তক্ষয়ী নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন সম্প্রতি বলেছেন, “আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়নসহ প্রায় ৫ স্তরের বিশাল এই কর্মযজ্ঞে আমরা কোনও রক্তপাত চাই না। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া সংঘাতমুক্ত নির্বাচন সম্ভব নয়।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবার শুরুতেই সেনাবাহিনী মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তবে সংঘাত এড়াতে পুরো দেশে একদিনে ভোট না করে ধাপে ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, ধাপে ধাপে নির্বাচন হওয়ায় পুলিশ ও নিজস্ব ফোর্স দিয়েই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে কোনও এলাকায় বেশি সহিংসতা দেখা দিলে পরবর্তী ধাপে সেখানে প্রয়োজন সাপেক্ষে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
সংসদ সদস্যদের ওপর নজরদারি
নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রভাব বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে কমিশন। আইন অনুযায়ী এমপিরা শুধু ভোট দিতে নিজ এলাকায় যেতে পারবেন, কিন্তু কোনও প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। এছাড়া উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের বসার এখতিয়ার ও কর্তৃত্ব নিয়ে বর্তমানে কমিশনে পর্যালোচনা চলছে, যা দ্রুতই চূড়ান্ত করা হবে।
