
লেখক: শেখ ফরিদ উদ্দিন
একটি দেশের সুশাসন ও কাঠামোগত উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দক্ষ আমলাতন্ত্র। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মো: এহছানুল হক। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে একজন সফল, দূরদর্শী ও অনুকরণীয় জন প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মো: এহছানুল হক ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার আইউবপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ ও পারিবারিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই ব্যক্তিত্ব পরবর্তী সময়ে দেশের প্রশাসন ব্যবস্থার অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে সমাদৃত হন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাদারত্ব
একজন সফল প্রশাসকের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপরিহার্য, যার প্রতিফলন দেখা যায় মো: এহছানুল হকের শিক্ষা জীবনে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন:
- ১৯৭৫: হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি।
- ১৯৭৬: ফিন্যান্সে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি।
জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা থেকে পরবর্তীতে তিনি আইন বিষয়েও স্নাতক (এলএলবি) এবং স্নাতকোত্তর (এলএলএম) ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও, তিনি দেশে ও বিদেশে আইন, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ, ব্যাংকিং এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ওপর উচ্চতর পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, যা তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতাকে আরও শাণিত করেছে।
কর্মজীবনের সূচনা ও মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা
বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের এই সদস্য মাঠ প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায় থেকে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে তিনি মাঠ প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন:
- সহকারী কমিশনার ও প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট
- উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট
- উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)
- বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক
- জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক (ডিসি)
মাঠ পর্যায়ের এই সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে জনগণের সমস্যা ও প্রশাসনিক জটিলতাগুলো খুব কাছ থেকে বুঝতে এবং তা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করেছে।
সরকারের কেন্দ্রীয় ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা
মাঠ প্রশাসনের সফলতার পর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এবং শীর্ষ সংস্থায় তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন:
- অর্থ বিভাগ ও জননিরাপত্তা বিভাগে।
- প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে।
- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে।
- ২০১৩ সালের বেতন ও চাকরি কমিশনের সদস্য সচিব হিসেবে, যা দেশের সরকারি কর্মচারীদের কাঠামো নির্ধারণে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা ছিল।
চুক্তিভিত্তিক পুনঃনিয়োগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব
অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়ার পরও তাঁর দক্ষতা ও সততার কারণে রাষ্ট্র পুনরায় তাঁর সেবা গ্রহণ করে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ১৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক সচিব হিসেবে প্রশাসনে ফিরিয়ে আনে।
প্রশাসনে ফেরার পর তাঁর ওপর রাষ্ট্রের আস্থা ছিল অনন্য:
- প্রথমে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ-এর সচিব এবং এর পরদিনই সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি পান।
- পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়-এর সিনিয়র সচিব হিসেবে।
- সবশেষে, ১২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তিনি দেশের সিভিল প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন।
একজন সফল জন প্রশাসক হিসেবে মূল্যায়নের প্রধান দিকসমূহ
১. সংকটে নির্ভরযোগ্যতা: ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এক চরম প্রশাসনিক ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্র তাঁর ওপর আস্থা রেখে ফিরিয়ে আনে। এটি প্রমাণ করে যে, সংকটকালীন সময়ে দেশ পরিচালনার জন্য তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ জন প্রশাসকের বিকল্প নেই।
২. বহুমুখিতা (Versatility): অর্থ, আইন, পর্যটন, পরিবহন, রেলপথ থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটি একজন “জেনারেলিস্ট” আমলার চরম উৎকর্ষতার প্রতীক।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: ২০১৩ সালের বেতন ও চাকরি কমিশনের সদস্য সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল পদে তাঁর ভূমিকা দেশের সামগ্রিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মো: এহছানুল হকের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সততা, মেধা, এবং দীর্ঘ কর্মঅভিজ্ঞতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে তাঁর চরিত্রে। তৃণমূলের ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের জনপ্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ অলঙ্কৃত করার এই যাত্রা তরুণ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের জন্য এক মহান অনুপ্রেরণা। তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং একজন সফল এবং আদর্শ জন প্রশাসক হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।
