
জ্যেষ্ঠতা ও পদায়ন নিয়ে অভিযোগ, প্রজন্ম ’৭১-এর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন—বিদেশি প্রভাবের অভিযোগেরও তদন্ত দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হলেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন। তিনি শেখ সালমা নার্গিস। বর্তমানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব), শিক্ষাক্রম ও গবেষণা শাখা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অধিদপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকাতেও তার নাম ও বর্তমান দায়িত্ব উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, অতীতে আওয়ামী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের শেখ হাছিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সাংগঠনিক প্রভাবের কারণে তিনি প্রশাসনে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। এমনকি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পেছনে ফেলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের গ্রেডেশন তালিকা, পদায়ন আদেশ, সার্ভিস রেকর্ড ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করা জরুরি।
আওয়ামী প্রজন্মলীগ ’৭১-এর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন সালমা নার্গিস
শেখ সালমা নার্গিসের সংগঠনভিত্তিক রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রকাশ্য নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন রয়েছে।
২০২১ সালের ১৪ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একুশে টেলিভিশন জানায়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তানদের সংগঠন আওয়ামী প্রজন্মলীগ ’৭১-এর নতুন নির্বাহী পরিষদে শেখ সালমা নার্গিসকে সহসভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সংগঠনের বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে তার নাম সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালের আরেক প্রতিবেদনে তাকে একই সংগঠনের সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করে কিশোরগঞ্জে সংগঠনটির জেলা কমিটি গঠনের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির কথা জানানো হয়।
অর্থাৎ, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন—এ তথ্য প্রকাশিত সংবাদসূত্রে পাওয়া যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সরকারি চাকরির আচরণবিধি অনুযায়ী এ ধরনের সাংগঠনিক পদে থাকা অনুমোদিত ছিল কি না? যদি অনুমোদিত হয়ে থাকে, তার ভিত্তি কী? আর যদি বিধিনিষেধ থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তখন কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের টপকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার অভিযোগ
সালমা নার্গিসকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো তার জ্যেষ্ঠতা ও পদায়ন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ের গ্রেডেশন অনুযায়ী তার অবস্থান আরও নিচে থাকার কথা থাকলেও বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার অবস্থান ১২ নম্বরের দিকে থাকার কথা থাকলেও তাকে ১ নম্বরে দেখানো হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এই দাবির চূড়ান্ত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মূল গ্রেডেশন তালিকা প্রয়োজন।
এ কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে সরাসরি প্রশ্ন—
কোন গ্রেডেশন তালিকার ভিত্তিতে সালমা নার্গিসের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়েছিল?
তার আগে থাকা কর্মকর্তারা কারা ছিলেন?
তাদের বাদ দিয়ে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ কী?
কোন কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছিল?
আর যদি গ্রেডেশন তালিকা যথাযথ নিয়মেই তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি প্রকাশ করে বিতর্কের অবসান করা সম্ভব।
‘তদবিরে’ পদ পাওয়ার অভিযোগ, নেই কি তদন্তের প্রয়োজন?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাব বা সুপারিশের মাধ্যমে সালমা নার্গিস অপেক্ষাকৃত জুনিয়র অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন।
তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত তদবিরে তিনি পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগকারিদের দাবী।
ফলে এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং যাচাইযোগ্য প্রশাসনিক অভিযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট সময়ের ফাইল, নোটশিট, অফিস আদেশ, গ্রেডেশন তালিকা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা।
কারণ যদি নিয়ম মেনেই তার পদায়ন হয়ে থাকে, তাহলে সেটি নথির মাধ্যমে পরিষ্কার করা সম্ভব। আর যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দায় নির্ধারণও সম্ভব।
শিক্ষাক্রম ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কেন বহাল?
বর্তমানে সালমা নার্গিস যে শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন সেটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২৬ সালের সরকারি নথিতেও তাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে।
এমনকি ২০২৬ সালের একটি দাপ্তরিক কার্যক্রমেও তার স্বাক্ষরে প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষক সহায়িকা ও সম্পূরক পঠন সামগ্রী বিতরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি এখনো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
তাই অতীতের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, পদায়ন এবং জ্যেষ্ঠতা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে সেগুলো উপেক্ষা না করে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের’ অভিযোগ—তদন্ত কোথায়?
সালমা নার্গিসকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন।
তবে যদি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার কাছে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি, যোগাযোগের প্রমাণ, অর্থনৈতিক লেনদেনের তথ্য, তদন্ত প্রতিবেদন বা অন্য কোনো যাচাইযোগ্য উপাদান থাকে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।
কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা বিদেশি রাষ্ট্র বা গোয়েন্দা সংস্থার স্বার্থে কাজ করেছেন—এমন অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
শিক্ষাব্যবস্থায় তার সিদ্ধান্তগুলোও কি পর্যালোচনা হবে?
সালমা নার্গিস বর্তমানে শিক্ষাক্রম ও গবেষণা সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকায় আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—তার দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কতটা নিয়মতান্ত্রিক ছিল?
বিশেষ করে—
শিক্ষাক্রম ও গবেষণাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত;
শিক্ষক সহায়িকা ও সম্পূরক পঠনসামগ্রী;
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম;
শিক্ষা উপকরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত;
বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব;
প্রশাসনিক পদায়ন ও অনুমোদন—
এসব বিষয়ে তার দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্তগুলো প্রয়োজনে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
এতে কোনো কর্মকর্তাকে পূর্বধারণার ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা হবে না; বরং নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল কি না, সেটিই যাচাই হবে।
কর্তৃপক্ষের কাছে ৮ প্রশ্ন
বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট মহল-
১. সালমা নার্গিসের বর্তমান পদে দায়িত্ব দেওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও অফিস আদেশ কী?
২. ওই সময়কার অনুমোদিত গ্রেডেশন তালিকায় তার অবস্থান কত নম্বরে ছিল?
৩. তার আগে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা থাকলে তাদের বাদ দেওয়ার কারণ কী?
৪. তার পদায়ন বা দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুপারিশ বা প্রশাসনিক নোট ছিল কি না?
৫. সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় আওয়ামী প্রজন্মলীগ’৭১-এর কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না?
৬. এ বিষয়ে কখনো কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না?
৭. তার বিরুদ্ধে বিদেশি রাষ্ট্র বা গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার কাছে আছে কি না?
৮. থাকলে সে বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না?
