
সাইফুল ইসলামঃ
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে শুরুতে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদীয় আসনের সুবিধা পেলেও অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি সংকট, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও দলীয়করণের অভিযোগসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কেউ ‘হানিমুন পিরিয়ড’ হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ের মধ্যে সরকার পরিচালনায় প্রত্যাশিত দক্ষতা ও দৃশ্যমান সাফল্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্প খাত ও জনপ্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ এম শাহান বলেন, সরকারের হানিমুন পিরিয়ড শেষ হয়েছে। এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দৃশ্যমান ফলাফল দেখাতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, লোডশেডিং ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সরকারের রাজনৈতিক সমর্থন কমে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক সরকারের ছয় মাসকে ‘মিশ্র সফলতা’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি ইতিবাচক হলেও শিল্প ও উৎপাদন খাতের ধীরগতি মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞার মতে, ছয় মাসে সরকারের সার্বিক মূল্যায়ন করা কঠিন হলেও আত্মমূল্যায়নের জন্য এই সময় যথেষ্ট। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলাফল দেখতে আরও সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তবে জনপ্রশাসন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন কয়েকজন গবেষক ও সাবেক আমলা। তাদের অভিযোগ, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ওএসডি সংস্কৃতির প্রত্যাবর্তন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম বলেন, মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার বিচ্যুত হয়েছে। তার মতে, কাঠামোগত সংস্কারের বদলে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক চর্চাই এখনো অব্যাহত রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খানও সরকারের সামনে দলীয়করণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তার অভিযোগ, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকার এখনো প্রত্যাশিত দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং জনগণ কী ধরনের সেবা পাচ্ছে—এসব বিষয়েই সরকারের কার্যকর নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে ঘিরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারে সরকার আগামী ছয় মাসে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে সরকারের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।
