
প্রতিবেদক: শেখ ফরিদ উদ্দিন:
দীর্ঘ কর্মজীবনে কর প্রশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে দক্ষতা ও সুনামের স্বাক্ষর রাখা ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া এবার দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর এই নিয়োগকে আর্থিক খাত ও প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক কর কমিশনার ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।
তাঁর নিয়োগের মধ্য দিয়ে কর প্রশাসন ও আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবার দুর্নীতি প্রতিরোধ, অনুসন্ধান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, পূর্বের কর্মঅভিজ্ঞতার আলোকে তিনি দুদকের কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদারে ভূমিকা রাখবেন।
কর প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার অন্যতম ভিত্তি হলো দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর প্রশাসন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর প্রশাসনে দীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর প্রশাসক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।
কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কর আহরণ বৃদ্ধি, করদাতাদের সেবার মানোন্নয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান কর্মজীবনে তাঁকে বিশেষ দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।
এফআরসিতে গতিশীল নেতৃত্ব
জাতীয় রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনি এফআরসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একটি অপেক্ষাকৃত স্থবির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় নতুন গতি সঞ্চারের উদ্যোগ নেন। আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, হিসাবব্যবস্থা ও করপোরেট সুশাসনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এফআরসিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
মাত্র প্রায় ১৫ মাসের দায়িত্বকালেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।
২০২৪ সালের ১৭ জুন তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. হামিদ উল্লাহ ভূঁইয়ার আকস্মিক মৃত্যুর পর এফআরসির চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। পরবর্তী সময়ে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেন।
শিক্ষা ও একাডেমিক জীবন
ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার পেশাগত সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী শিক্ষাগত ও একাডেমিক ভিত্তি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে ১৯৮৫ সালে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর (M.Com) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তীতে তিনি ফিন্যান্স বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রশাসনিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁর একাডেমিক সম্পৃক্ততাও রয়েছে। তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (DIU) বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে অ্যাডজান্ট প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ফলে কর প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং একাডেমিক দক্ষতার সমন্বয় তাঁর পেশাগত পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ১৯৬৩ সালের ১৫ অক্টোবর কুমিল্লা জেলার তিতাস উপজেলার বাতাকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পারিবারিক জীবনও সরকারি ও পেশাগত ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর দুই ভাই মো. জাহিদ হোসেন ভূঁইয়া ও ডা. মো. সায়িম রহমান ভূঁইয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা যায়।
আর্থিক খাত থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে
কর প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা, সরকারি অর্থব্যবস্থাপনা, করদাতা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার রয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে এফআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা ও করপোরেট সুশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কাজ করার সুযোগ পান।
দুদকের মতো একটি সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সরকারি রাজস্ব, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, সম্পদের অসঙ্গতি এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে আসতে পারে।
একজন অভিজ্ঞ কর প্রশাসক হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার পাশাপাশি আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি সক্ষমতা দেবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
যোগ্য নেতৃত্বের প্রত্যাশা
দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ, অনুসন্ধান ও দমন কার্যক্রমে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকার জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, সততা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, আর্থিক খাতের জ্ঞান এবং এফআরসিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা দুদকের দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁর দায়িত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক করা। একই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক অনিয়ম শনাক্তকরণ এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করার বিষয়েও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
সব মিলিয়ে ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া শুধু একজন সফল কর প্রশাসক নন; তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও একাডেমিক জ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক ও নীতিনির্ধারক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে তাঁর দীর্ঘ কর্মঅভিজ্ঞতা এবং এফআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এখন দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, অতীতের কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এবং দেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবেন।
