
— শেখ ফরিদ উদ্দিন
গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে যাচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ হলেও এটি মূলত অলংকারিক ও নির্বাহী ক্ষমতাহীন। তবে এই অলংকারিক চরিত্রটি উজ্জ্বল থাকে কেবল স্বাভাবিক রাজনীতি ও সুশাসনের সময়কালে। যখনই রাষ্ট্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট, সাংবিধানিক অচলবস্থা কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখনই এই পদটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত প্রজ্ঞা ও অভিভাবকত্বের প্রতীক। সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অরাজনৈতিক, নির্দলীয় ও সবার শ্রদ্ধাভাজন হবেন—এমনটিই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ কোনো একক ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বর্তমান সমাজে প্রায় অসম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে অতি-নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কোনো আমলা বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন করার সাম্প্রতিক গুঞ্জন দেশপ্রেমিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতন মহলকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বনাম অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি: কৌশলগত বিপত্তি কোথায়?
রাজনীতির অলিগলি না চেনা কোনো আমলা বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে রাষ্ট্রে সর্বাধিনায়কের আসনে বসালে কী ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন:
- সংকটকালে দূরদর্শিতার অভাব: অরাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তিরা প্রশাসনিক প্রটোকলে দক্ষ হলেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রায়শই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তারা রাষ্ট্র ও দেশের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষায় ত্বরিত ও সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে তারা এতটাই নমনীয় বা সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়েন যে, তা প্রকারান্তরে মূল রাজনৈতিক শক্তি ও দেশের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
- রাজনীতিবিদদের অবমূল্যায়ন: জীবনভর রাজনীতি করে আসা, সততা ও ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জ্যেষ্ঠ নেতাদের টপকে কোনো আমলা বা সুবিধাভোগীকে সুযোগ দিলে তা রাজনীতিবিদদের জন্য চরম অবমাননাকর। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে এবং তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি-বিমুখ করে তোলে।
- চক্রের পুতুল হওয়া: রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকায় একজন অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি অস্থিতিশীল সময়ে অসাংবিধানিক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে সহজে রাজনৈতিক পাশা খেলার চালে পরিণত হতে পারেন।
ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার শিক্ষা: ১৯৯৬ বনাম ২০০৭ সাল
বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি উজ্জ্বল উদাহরণ এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় দলিল:
- ১৯৯৬ সালের প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা: তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন একজন পাকা রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানচেষ্টা তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার সঙ্গে এক তুড়িতেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণেই তিনি প্রশাসনিক ও সামরিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্রকে এক মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিলেন।
- ২০০৭ সালের সিদ্ধান্তহীনতার ট্র্যাজেডি: বিপরীতে, ২০০৭ সালে মহামান্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন সজ্জন কিন্তু অরাজনৈতিক শিক্ষাবিদ। রাজনৈতিক কৌশলের জটিলতা না বোঝার কারণে তিনি অসাংবিধানিক শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হন। তার সিদ্ধান্তহীনতা ও অতি-নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে তথাকথিত মইন-মাসুদ চক্র ক্ষমতা দখল করে এবং দেশকে দীর্ঘস্থায়ী গভীর রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়।
পাশাপাশি, শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ ছিল রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন একচ্ছত্র প্রশাসনিক মানসিকতা, যা সংকটকালীন মুহূর্তে জনগণের স্পন্দন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভাষা বুঝতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
উপসংহার
রাষ্ট্রপতি পদে কেবল একজন ‘ভোলাভালা’ বা ভালো মানুষ বসানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, ত্যাগ এবং সংকট মোকাবিলার মতো সাহসী নেতৃত্ব। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব দিয়ে রাজনৈতিক ঝোড়ো হাওয়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জাঁদরেল সাবেক আমলা, অনভিজ্ঞ প্রবাসী ব্যক্তিত্ব কিংবা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর চিন্তা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ারই নামান্তর।
তাই চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, জাতীয়তাবাদী শক্তির মূলধারায় পরীক্ষিত, সৎ, সাহসী ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একমাত্র সঠিক ও যথোপযুক্ত বিকল্প। মনে রাখা প্রয়োজন, রাজনীতিকে রাজনীতিবিদের হাতে রাখাই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত।
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
