নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে চলা সহিংস আন্দোলনে ছাত্র-জনতার প্রাণহানির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে মোট ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। দীর্ঘ সময় আলোচনার বাইরে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সহিংসতার বিস্তার ও প্রাণহানি
তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় সংঘর্ষে একসঙ্গে ১৫ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান, যা একক কোনো থানায় সর্বোচ্চ নিহতের ঘটনা। এছাড়া ঢাকা মহানগর ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৯ জন, গাজীপুরে ১ জন, কুমিল্লার তিতাসে ২ জন, চাঁদপুরের কচুয়ায় ১ জন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে ২ জন, কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশে ১ জন, হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ১ জন, নারায়ণগঞ্জ পিবিআইতে ১ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখা দেয়। জনরোষের আশঙ্কায় অনেক পুলিশ সদস্য দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেন। বহু থানা অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং কিছু স্থানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কেন
ছাত্র-জনতার মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করলেও পুলিশ সদস্যদের হত্যার বিষয়টি প্রথম দিকে অগ্রাধিকার পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সূত্রের দাবি, গণআন্দোলনের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা দায়মুক্তি-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ তদন্তকে জটিল করে তোলে। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে ওই অধ্যাদেশ জারি হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হত্যাকাণ্ড যে পক্ষের বিরুদ্ধেই হোক না কেন, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
মামলা কম, প্রশ্ন বেশি
৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হলেও সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক চাপ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে অগ্রগতি ধীরগতির হয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট হামলার আগে ও পরের ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেছে বলেও জানা গেছে।
পাল্টা মামলা ও চলমান তদন্ত
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে দুই হাজারের বেশি মামলা। এসব মামলায় ১ হাজার ১৬৮ জন পুলিশ সদস্য আসামি রয়েছেন, যার মধ্যে ৬১২টি হত্যা মামলা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বর্তমানে ৬৮টি মামলা তদন্ত করছে; সেখানে ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
তদন্তকারীরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জরুরি। একইসঙ্গে ছাত্র-জনতা হত্যার মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
সরকারের অবস্থান
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনা নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে চাননি।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যেই জড়িত থাকুক না কেন, প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবে অগ্রগতি জানানো হবে।”
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড—পুলিশ ও বেসামরিক নাগরিক—উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
