• বুধ. আগ ২৬, ২০২৬

Daily Shirso Aparadh

ঘটনার অন্তরালের সত্য উদ্‌ঘাটনে

নুসরাত হত্যা: ৭ বছর পর হাইকোর্টের রায়ে বদলে গেল ১৬ আসামির সাজা

ByShirso Aparadh

আগ ২৪, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাত বছর আগে ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে হাইকোর্টে। সোমবার (২৪ আগস্ট) বহুল আলোচিত মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রায়ে তৎকালীন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন—নুর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি। খালাস পাওয়া ১০ আসামির মধ্যে রয়েছেন রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

যে ঘটনার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ

২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর নুসরাতের মা তার বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে।

মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাত ও তার পরিবারকে চাপ দেওয়া হলেও তিনি অভিযোগ থেকে সরে দাঁড়াননি। এর কয়েকদিন পর, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে ফেনী ও পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।

মৃত্যুর আগে নুসরাতের জবানবন্দি

নুসরাতের মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায়ও তিনি হামলার আগে কীভাবে তাকে ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেখানে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তথ্য দেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, নুসরাত জানান, বোরকা-নেকাব পরা কয়েকজন তাকে ফুসলিয়ে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা বলে স্বীকার করতে এবং মামলা প্রত্যাহার করতে বলা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

নুসরাতের সেই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগুনে শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলেও মৃত্যুর আগে তিনি ঘটনার বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—যা মামলাটিকে দেশজুড়ে আলোচিত করে তোলে।

নিম্ন আদালতের ঐতিহাসিক রায়

দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। পরে মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

তবে হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানির পর নিম্ন আদালতের সেই রায়ে বড় পরিবর্তন আসে। ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয় এবং ২০ আগস্ট রায় ঘোষণার জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়।

১৬ জনের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্ন

হাইকোর্টের আজকের রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একটি হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক আসামির পৃথক ভূমিকা যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি বলে হাইকোর্ট মনে করেছেন। আদালত ওই রায়কে ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনগুলোতে এসেছে। এ বিষয়ে ফেনীর ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কমানোর জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।

নুসরাত হত্যা মামলার বর্তমান চিত্র

হাইকোর্টের রায়ের পর মামলায়—

মৃত্যুদণ্ড বহাল: ২ জন
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: ৪ জন
খালাস: ১০ জন

অর্থাৎ, ২০১৯ সালে যে মামলায় ১৬ আসামির সবাই মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, হাইকোর্টের রায়ে তাদের মধ্যে মাত্র দুজনের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকল।

নুসরাতের ওপর হামলা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল না; যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানানোর পর একজন শিক্ষার্থীর ওপর পরিকল্পিত হামলার ঘটনায় এটি দেশজুড়ে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। হাইকোর্টের আজকের রায় সেই আলোচিত মামলার বিচারিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights