
একরামুল হকঃ
বিমা খাতে বছরের পর বছর ধরে চলা গ্রাহক হয়রানি, জালিয়াতি এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম রুখতে এবার চূড়ান্ত অ্যাকশনে নামছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার ও বিমা খাতের সক্ষমতা বাড়াতে তিন স্তম্ভের একটি সমন্বিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বা সংস্কার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। একই সঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমানে বিমা কোম্পানিগুলোর আটকে রাখা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তি করাই হবে তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
শনিবার (২৭ জুন) ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে তিনি এই কড়া বার্তা দেন।
ফাঁকিবাজ কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, দেশের জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বিমা দাবি ঝুলিয়ে রেখেছে, যা এক ধরনের চরম গ্রাহক হয়রানি। এসব অনিয়ম দূর করতে প্রতিটি বিমা কোম্পানির সঙ্গে পৃথকভাবে বসা হবে। কোনো কোম্পানি যদি গ্রাহকের টাকা দিতে গড়িমসি করে, তবে তাদের সম্পদ বিক্রি করে কিংবা আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার করে হলেও বিমা দাবি পরিশোধে বাধ্য করা হবে। এ ক্ষেত্রে আইডিআরএ কঠোর সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে।
দুর্বল ব্যাংক ও বেইলআউট প্যাকেজের হুশিয়ারি
তদন্তে দেখা গেছে, অনেক বিমা কোম্পানির স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) বিশাল অঙ্কের টাকা বিভিন্ন দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকে আটকে আছে। এই অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করা হবে।
চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন, সব ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি গ্রাহকদের দেনা পরিশোধ করা না যায়, তবে শেষ অস্ত্র হিসেবে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) ‘বেইলআউট প্যাকেজে’র প্রস্তাব দেওয়া হবে। তবে সরকারের কাছে যাওয়ার আগে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সুশাসন ও কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
শেয়ারবাজার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কড়া নির্দেশ
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর যে সংকট রয়েছে, তা দূর করতে বিমা কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বিমা কোম্পানিগুলোর জমানো টাকা শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে ব্যবহার করা হবে।
পাশাপাশি, বাংলাদেশে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের নামে যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়, তা মোকাবিলায় বিমা খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। এছাড়া তাকাফুল (ইসলামি বিমা) ও ক্ষুদ্র বিমা (মাইক্রোইনস্যুরেন্স) খাতের দুর্নীতি ও ফাঁকফোকর বন্ধে দ্রুত নতুন এবং কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
‘অংশীদারিত্ব না থাকলে রেহাই নেই’
বিমা খাতের দুর্নীতি ও ধস ঠেকাতে তিন পক্ষের (সরকার, শিল্পমালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা) সমন্বিত সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হতে হবে। তবে অনিয়ম ও সুশাসনের অভাব কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী।
