• মে ২০, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

ফেনী, আমার ফেনী- মোঃ আবদুল লতিফ জনি

Byadmin

এপ্রিল ৪, ২০২৬


ফেনী একটি নাম, একটি ঘটনাবহুল ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রাচীন জনপথ। প্রাচীন যুগে “সমতট ও হরিকেল্লা”, মধ্যযুগে “আমিরাবাদ/আমিরগাঁও”, নবাবী যুগে ”খাইয়ারা খন্ডল”। সর্বশেষ আজকের ঐতিহ্যবাহী “ফেনী”। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে বহু নগর, বহু জনপথ সৃষ্টির ধারাবাহিক ইতিহাসই আজকের সভ্য আধুনিক দুনিয়ার নগর, বন্দর, বিলাসী অট্টালিকার সীমাহীন বিস্তার লাভ করেছে। তেমনি ফেনী নদীর তীর ঘেঁষা “খাইয়ারা জনপথ” কালের পরিক্রমায় ফেনী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারতের দেওয়ানি প্রথা, “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত”, “জমিদারি” ও পাট্টা প্রচলন শুরু হলে ক্রমন্বয়ে ফেনী শহরের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফেনী শহরের গুরুত্ব জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-আমেরিকার এলাইড ফোর্স (মিত্রবাহিনী) কর্তৃক নির্মিত (১৯৪০-৪২ সাল) বিমানবন্দর আজও টিকে আছে শহরের উত্তরাংশের বারাহিপুর নামক স্থানে।

এ বিমানবন্দর ব্যবহৃত হতো জাপানি রয়্যাল আর্মি ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর “আজাদ হিন্দ ফৌজ”-এর বিরুদ্ধে তাদের যৌথবাহিনীর অগ্রাভিযান ঠেকাতে। এখনো যুদ্ধের স্মৃতিভরা এয়ার ডিফেন্স ট্যাক্সিওয়ে, শতাধিক সুরক্ষিত হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সের সাথে সংযোগ সড়ক বিমানবন্দরের চারদিকে রানওয়ে থেকে নির্দিষ্ট দূরে বিদ্যমান। প্রতিটি হ্যাঙ্গারে সুরক্ষিত ও প্রস্তুত থাকত একাধিক যুদ্ধবিমান। প্রতিটি হ্যাঙ্গার সুউচ্চ কংক্রিটের মজবুত দেয়াল দ্বারা আবৃত থাকত, যা এখনো দৃশ্যমান।

এই ফেনীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক ইতিহাস। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও আজও সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে ওই সব স্মৃতিগাঁথা উপাখ্যানগুলো।

যেমন মুঘল যুগে ফেনীর কৃতী সন্তান শমশের গাজী, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুতুল নবাব বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ও ইংরেজ বণিক “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি”-র দ্বৈতশাসনের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের জনগণকে সংঘবদ্ধ করে ত্রিপুরা, ফেনী, মিরেশ্বরাই এলাকাকে নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। জনগণের কল্যাণে বহুবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজ্য “খাইয়ারা খন্ডল” মাত্র ১২ বছর টিকে ছিল। নবাব মীর কাশেমের নির্দেশে এই বীর সেনানীকে কামানের গোলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মাঝখানে সেই সময়ে খননকৃত “কৈয়ারা দীঘি” কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে।

দাগনভূঁইয়া উপজেলায়, উত্তর জায়লস্কর, দক্ষিণ জায়লস্কর মুঘল যুগে আরাকান মগ ও পর্তুগিজ বর্গী এবং জলদস্যু দমনে মুঘল সৈন্যদের ব্যবহৃত (ঘাঁটি) জায়গা হিসেবে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে।

তেমনি মহিপালের চাঁড়িপুর দীঘি, এর দক্ষিণে বিজয়শিং গ্রামে বিখ্যাত বিজয়সেন দীঘি, ছোট সর্দার দীঘি, ফেনী শহরের কেন্দ্রস্থলে রাজাজির দীঘি, ফেনী শহরের উকিল পাড়াস্থ রাজবাড়ীর প্রাচীন ইতিহাসের অনুষঙ্গ হয়ে আজও টিকে আছে। এ ছাড়া ফেনী জেলার প্রতিটি গ্রামে প্রতিটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইতিহাসের নানা ঘটনাবহুল কাহিনী।

বাংলার স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দিন মুবারক শাহ আরাকান রাজাকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করেন এবং রাজধানী সোনারগাঁও থেকে কুমিল্লা, ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করেন, যা ফেনী ট্রাঙ্ক রোড হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে আবার মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খান কর্তৃক আরাকান রাজাকে পরাজিত করে রাজধানী “ম্রাউক ইউ” দখল করতে যে বিশাল নৌবহর ও সৈন্যবাহিনী নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন, তাতে ফেনী নদী ও ট্রাঙ্ক রোড ব্যবহারের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।

মুঘল শাহজাদা শাহ সুজা ত্রিপুরা রাজার সহযোগিতায় আরাকান যাওয়ার পথে এই ফেনী হয়েই আরাকানে গিয়ে আরাকানি রাজার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কুমিল্লা, ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ট্রাঙ্ক রোডের ওপর ওই সময়ের এক ঐতিহাসিক ‘রেনট্রি গাছ’ আজও ফেনী শহরের উকিল পাড়াস্থ দাউদপুর ব্রিজের পাশে জীবন্ত কালের সাক্ষী, যার বয়স আনুমানিক ৪০০ বছরেরও বেশি।

ফেনী জেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট-বড় অনেক নদী, যা ফেনী জেলাকে করেছে সমৃদ্ধ ও উন্নত। ফেনী নদী, কালীদহ নদী, ছোট ফেনী নদী, মহুরী নদী, সিলোনিয়া নদীসহ অসংখ্য নদী/খাল।

এই ফেনী জেলায় জন্ম নিয়েছেন অনেক বিখ্যাত রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্যাংকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ক্রীড়াবিদ।

ব্রিটিশ যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর স্যার এফ রহমান, যুক্ত পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ডেইলি অবজারভার পত্রিকার মালিক প্রয়াত রাজনীতিক হামিদুল হক চৌধুরী, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মোহামেডান ক্লাবের সাবেক স্ট্রাইকার প্রয়াত গোলাম নবী চৌধুরী, ফেনীর জনমানুষের নেতা প্রয়াত খাজা আহম্মেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রয়াত জহির রায়হান ও শহীদুল্লাহ কায়সার, প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট এবিএম মূসা, গিয়াস কামাল চৌধুরী, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, খন্দকার মোজাম্মেল হক, মোয়াজ্জেম হোসেন, বেসরকারি ব্যাংক/বীমা প্রতিষ্ঠার অগ্রপথিক মুজিবুল হায়দার চৌধুরীসহ অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী এই ফেনী জেলার কৃতী সন্তান। সময়ের স্বল্পতা ও লেখার সংক্ষিপ্ততার কারণে অনেক কৃতী মানুষের নাম লিখতে পারিনি বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনী ছিল উন্মুক্ত রণাঙ্গন। বহু মুক্তিযোদ্ধার রক্তে রাঙানো অলিগলি, আঙিনা, গ্রাম-জনপথে যুদ্ধাহত বীর সেনানীদের চিহ্ন, বিচ্ছিন্ন দেহাবশেষের ইতিহাস ফেনী নিদারুণ কষ্টে বুকে ধারণ করে আছে স্বজন হারানোর বিয়োগ-বেদনার করুণ কাহিনীগুলো। আজও খুঁজে ফেরেন সন্তানহারা মা, পিতৃহারা মেয়ে, ভাই হারানো বোন তাদের প্রিয় স্বজনদের।

ফেনী জেলার বহু খেতাবপ্রাপ্ত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা এখনো জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে আছেন। যথাযথ সম্মান ও উপযুক্ত মূল্যায়ন আমরা তাদের এখনো দিতে পারিনি। দেশমাতৃকার টানে যারা জীবনের সমস্ত লোভ, স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মায়ের পবিত্র ভালোবাসা, আদর-সোহাগ ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধের ভয়াল প্রান্তরে—আমরা কি তাঁদের সীমাহীন ত্যাগের কথা মনে করি? মর্যাদা ভরে তাদের স্মরণ করি?

এত সমৃদ্ধ জনপথ, এত ঘটনাবহুল ঐতিহাসিক ফেনী জেলায় বহু প্রতিথযশা জ্ঞানী-গুণীর আদি জন্মস্থান হলেও ফেনী জেলায় নেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ কিংবা প্রকৌশল/কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। নিয়তির এক চরম সত্য—ফেনী জেলা বৈচিত্র্যময় এক অর্থনৈতিক সম্পদশালী উন্নত জেলা।

গত ২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লবের সময় ৪ আগস্ট ফেনীতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ৯ জন ছাত্রনেতাকে। তাদের পরিবারের কান্না, শোকের মাতম আজও ফেনী জেলার প্রতিটি প্রান্তরে সীমাহীন কষ্টের বেদনা নিয়ে বেঁচে আছে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights