• মে ২৯, ২০২৬ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

৩০ মে তিতাসে বদলে যেতে পারে রাজনৈতিক সমীকরণ: বাতাকান্দিতে ‘নতুন বার্তা’, বিএনপিতে কি বিকল্প নেতৃত্বের ইঙ্গিত?

ByShirso aparadh

মে ২৯, ২০২৬

কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি:

আগামী ৩০ মে (শনিবার) কুমিল্লার তিতাস উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের নতুন মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, ওই দিনের একটি বিশেষ আয়োজনকে ঘিরে বদলে যেতে পারে তিতাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণ; বিশেষ করে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক বাস্তবতা ও বর্তমান নেতৃত্বের প্রভাব।

​বৃহত্তর দাউদকান্দির উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও রাজনৈতিকভাবে উর্বর জনপদ হিসেবে পরিচিত বাতাকান্দি বাজার। এই অঞ্চলেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আধুনিক বাতাকান্দি বাজারের রূপকার ও কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন কোষাধ্যক্ষ মরহুম বেলায়েত হোসেন সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মরহুম জেড হক, মরহুম ধনমিয়া সাহেব, আঃ বারিক ডাক্তারসহ বহু গুণী ব্যক্তিত্বের জন্ম এই মাটিতে। ভৌগোলিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই জনপদ বর্তমানে নবগঠিত তিতাস উপজেলার জগতপুর, সাতানি ও বলরামপুর ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থল।

​বর্তমানে বাতাকান্দি বাজার উন্নয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এলাকার কৃতি সন্তান আলহাজ্ব মোঃ মাইন উদ্দিন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁরই উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় আগামী ৩০ মে তিতাসের রাজনীতিতে এক অভিনব সাংগঠনিক কৌশলের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই আয়োজনের মাধ্যমে তিতাস বিএনপির দীর্ঘদিনের একক সাংগঠনিক আধিপত্যে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলতে পারে, যার ফলে ম্লান হয়ে যেতে পারে বর্তমান প্রভাবভিত্তিক নেতৃত্বের রাজনীতি।

​শহীদ জিয়ার শাহাদাত বার্ষিকীকে ঘিরে ব্যতিক্রমী আয়োজন

​৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বাতাকান্দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকাস্থ তিতাস উপজেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের সহসভাপতি ও বাতাকান্দি বাজার উন্নয়ন কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ মাইন উদ্দিনের আয়োজনে এদিন দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা এবং দুস্থদের মাঝে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

​উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এফআরসি’র চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া এবং বিসিআইসির পরিচালক মোঃ দেলোয়ার হোসেন। এছাড়া ঢাকাস্থ তিতাস উপজেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানটি সফল করতে ইতোমধ্যে ঢাকায় একাধিক প্রস্তুতি বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে।

​তিন সংস্থার উদ্বোধন ও রাজনৈতিক কৌতূহল

​একই দিনে আলহাজ্ব মোঃ মাইন উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত তিতাসের উন্নয়ন ও দেশ-বিদেশে অবস্থানরত তিতাসবাসীর কল্যাণে গঠিত তিনটি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংস্থার শুভ উদ্বোধন করবেন এমপি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া।

​এই যৌথ আয়োজন ঘিরে তিতাসজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। স্থানীয়দের মতে, উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে শুধুমাত্র এমপি এবং ‘তিতাস ফোরাম’ এর নেতাদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আভাস দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এমপি সেলিম ভূঁইয়া দলীয় গণ্ডির বাইরে গ্রহণযোগ্য, শিক্ষিত, পরিচ্ছন্ন ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে একটি বিকল্প নেতৃত্বের বলয় গড়ে তুলতে চাইছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি উপজেলা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি এমপির আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ?

​‘ফোরাম বনাম দলীয় কমিটি’ আলোচনা তুঙ্গে

​স্থানীয় সাধারণ মানুষের মতে, তিতাস ফোরামের সদস্যরা সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, উচ্চশিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। এমন বাস্তবতায় ৩০ মে’র অনুষ্ঠানে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ না থাকা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

​এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান সেলিম ভূঁইয়া সংক্ষেপে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “ভাই, কি আর করা।”

​উপজেলা বিএনপির আরেক নেতা শরীফুল শিকদার বলেন, “আমরা দলীয়ভাবে কড়িকান্দি আঞ্চলিক অফিসে শহীদ জিয়ার শাহাদাত বার্ষিকী পালন করছি, আর বাতাকান্দিতে মাইন উদ্দিন ভাই আলাদা অনুষ্ঠান করছেন।”

​এদিকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকতারুজ্জামান সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এটি ভালো উদ্যোগ। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সর্বত্র শাহাদাত বার্ষিকী পালন করছি। তিতাস ফোরাম যদি সত্যিই উন্নয়ন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও কমিটি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কাজ করতে চায়, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। তিতাসকে একটি শান্তিময় মডেল উপজেলায় রূপান্তরে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

​তবে এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওসমান গনি ভূঁইয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

​বহিষ্কার, কমিটি ভাঙন ও নতুন নেতৃত্বের গুঞ্জন

​দলীয় সূত্র জানায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা-২ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তি তৈরি হয়েছিল। মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস আঃ মতিন খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলে তিতাস-হোমনার নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে উপজেলা ও ইউনিয়নের বহু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয় এবং কিছু কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

​বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এবার বলরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিও ভেঙে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে, কারণ বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতাদের কর্মকাণ্ডে এমপি সেলিম ভূঁইয়া সন্তুষ্ট নন। এছাড়া সম্প্রতি বলরামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি জালাল উদ্দীন ভূঁইয়ার বহিষ্কারাদেশ নিয়েও দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে।

​রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন রয়েছে, সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাগেরচর গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মনিরুজ্জামানের মতো ক্লিন ইমেজের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হতে পারে।

​সব মিলিয়ে, ৩০ মে’র বাতাকান্দির এই মেগা আয়োজনকে ঘিরে তিতাসের রাজনৈতিক আকাশে এখন নতুন সমীকরণের হাওয়া বইছে। আগামী দিনে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে কী ধরনের বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, তা দেখার অপেক্ষায় তিতাসবাসী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এখনই দেখুন

Verified by MonsterInsights