
- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পরীক্ষার্থী তথা ছাত্রসমাজের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি, ভাষার ব্যবহার এবং কৌশলগত রূপান্তর গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তবে আন্দোলনের যখন নিজস্ব কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা কিংবা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা আর ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনআকাঙ্ক্ষা’ থাকে না, বরং তা ‘অস্থিতিশীলতার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বা Psychological Warfare-এ রূপ নেয়।
শিক্ষামন্ত্রীর প্রাথমিক দূরদর্শিতার অভাব বা প্রশাসনিক শৈথিল্য সত্ত্বেও, যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরীক্ষার্থীদের প্রায় সকল যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রক্রিয়া চলমান, তখনো আন্দোলনের মাঠ উত্তপ্ত রাখার প্রবণতা ইঙ্গিত করে—এ আন্দোলনের চালিকাশক্তি এখন আর শিক্ষার্থীদের হাতে নেই, বরং তা দূর-নিয়ন্ত্রিত (Remote-Controlled)।
একজন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক হিসেবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের যৌক্তিকতার অবসান এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির তাত্ত্বিক ও বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করছি:
প্রাতিষ্ঠানিক দাবি বনাম ‘মোবাইল সাইকোলজি’ ও লিমিনাল ক্রাইসিস
আন্দোলনের প্রথম পর্বে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে একধরনের নৈতিক ও যৌক্তিক ভিত্তি ছিল। কিন্তু দাবি পূরণের পরও আন্দোলন টিকিয়ে রাখার যে কৃত্রিম প্রচেষ্টা, তা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় Liminal Crisis বা অন্তর্বর্তীকালীন সংকট তৈরি করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এবং টিকটক-ফেসবুকের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আবেগ ও মনস্তত্ত্বকে হাইজ্যাক করা হয়েছে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে “Hyper-reality” বা অতি-বাস্তবতা বলা হয়। এখানে সত্যের চেয়ে প্রোপাগান্ডা বা গুজব বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে, যা তরুণদের পড়ার টেবিল থেকে বিচ্যুত করে এক অন্তহীন নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রক্সি পলিটিক্স (Proxy Politics) এবং পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ (5GW)
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো আন্দোলনই একক বা বিচ্ছিন্ন নয়। ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের এই আবেগকে পুঁজি করে দেশবিরোধী ও আন্তর্জাতিক কুশীলবরা Fifth-Generation Warfare (5GW) বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ: ঠিক যেভাবে ২০১০ সালের ‘আরব বসন্ত’ (Arab Spring) কিংবা ইউক্রেনের ‘ইউরোমাইদান’ (Euromaidan) আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ক্ষোভকে পুঁজি করে পরবর্তীতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক ধসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে ঠিক একই ধরনের Subversive Activities বা রাষ্ট্র ভাঙার খেলা চলছে।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংঘর্ষ ও প্রোটোকল লঙ্ঘন
আন্দোলনের চিরাচরিত নিয়ম ভেঙে ইচ্ছাকৃতভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “Manufactured Violence” বা কৃত্রিম সহিংসতা। যখন কোনো পক্ষ রাষ্ট্রকে অকার্যকর প্রমাণ করতে চায়, তখন তারা এই ধরনের অপকৌশল অবলম্বন করে। শিক্ষার্থীদের অজান্তেই তাদের ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে নেপথ্যের নাটেরগুরুরা।
অভিভাবক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক অসচেতনতা (Parental Cognitive Dissonance)
একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন লাইনচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তখন অভিভাবকদের ভূমিকা হওয়া উচিত অভিভাবকত্বসুলভ ও কঠোর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অনেক অভিভাবকই সোশ্যাল মিডিয়ার ফেক নিউজ ও প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে সন্তানদের এই আত্মঘাতী পথে যাওয়ার মৌন বা প্রত্যক্ষ সম্মতি দিচ্ছেন। এটি সমাজকাঠামোর জন্য একটি মারাত্মক Cognitive Dissonance বা জ্ঞানীয় অসঙ্গতি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়: সংকট উত্তরণের পথ
উদ্ভূত এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে বহুমুখী ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য:
শিক্ষার্থীদের স্বগৃহে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাবর্তন:
আন্দোলনের ট্রেন ইতোমধ্যে লাইনচ্যুত। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে যে, দাবিনামা পূরণের পর আন্দোলন দীর্ঘায়িত করার অর্থ হলো নিজেদের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ষড়যন্ত্রকারীদের দাবার ঘুঁটি হওয়া। অতএব, অনতিবিলম্বে তাদের পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে হবে।
ডিজিটাল লিটারেসি ও প্রোপাগান্ডা প্রতিরোধ:
সোশ্যাল মিডিয়া ও ওপেন সোর্সে ছড়িয়ে পড়া প্রোপাগান্ডা রুখতে রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিক সমাজকে কাউন্টার-ন্যারেটিভ (Counter-Narrative) বা সত্য তথ্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। গুজব শনাক্তকরণ সেলগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা:
যারা পর্দার আড়াল থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়, সেই ‘নাটেরগুরু’দের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধী যেই হোক, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো আপস করা চলবে না।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের সমন্বিত কাউন্সিলিং:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং করতে হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে কীভাবে তাদের আবেগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হচ্ছে।
সকলকে মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। সচেতন নাগরিক সমাজ ও নির্বাচিত সরকার কোনোভাবেই এই সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতাকে নস্যাৎ হতে দেবে না। তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান—তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ, কোনো অপশক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার নও। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা অনতিবিলম্বে শ্রেণিকক্ষে এবং পরীক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে ফিরে যাও এবং মেধা ও মনন দিয়ে রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখো। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় তোমরাও ষড়যন্ত্রের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জাতির সূর্যসন্তান হিসেবে আমরা তোমাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই- পছন্দ তোমাদের।
লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
