
স্পোর্টস ডেস্ক:
বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে সেলেসাওদের। ম্যাচজুড়ে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো কাজে লাগাতে না পারা, কৌশলগত ভুল এবং একাধিক সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের।
এই হারের মধ্য দিয়ে টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপের কোনো দলের কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নিল ব্রাজিল। ম্যাচ বিশ্লেষণে তাদের বিদায়ের পেছনে ছয়টি বড় কারণ উঠে এসেছে।
১. একাদশ নির্বাচনে কোচের ভুল সিদ্ধান্ত
ইনজুরির কারণে লুকাস পাকুইতা দলে না থাকায় তার বিকল্প নির্বাচন ছিল কোচ কার্লো আনচেলোত্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সৃজনশীল মিডফিল্ডের দায়িত্ব নেইমারের ওপর না দিয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে শুরুর একাদশে রাখেন তিনি। আর্সেনাল তারকা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। ৬৭ মিনিট মাঠে থেকে সীমিত প্রভাব রাখতে সক্ষম হন এবং একটি নিশ্চিত গোলের সুযোগও নষ্ট করেন। ফলে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রাজিল পিছিয়ে পড়ে।
২. পেনাল্টির সুযোগ হাতছাড়া
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাওয়া পেনাল্টি ব্রাজিলের জন্য সমতায় ফেরার বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেন ব্রুনো গুইমারেস, যদিও দলে ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও ম্যাথিয়াস কুনার মতো অভিজ্ঞ পেনাল্টি টেকার ছিলেন। গুইমারেসের দুর্বল শট সহজেই রুখে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নাইলান্ড। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারত।
৩. মাঝমাঠে আধিপত্য হারানো
পাকুইতার অনুপস্থিতি ব্রাজিলের মিডফিল্ডে বড় প্রভাব ফেলে। নরওয়ের স্যান্ডার বার্গ, প্যাট্রিক বার্গ ও মার্টিন ওডেগার্ড পুরো ম্যাচে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের সফল পাসের সংখ্যা ছিল ব্রাজিলের মিডফিল্ডের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বলের নিয়ন্ত্রণ এবং খেলার গতি—দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল।
৪. গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থতা
ম্যাচে একাধিক পরিষ্কার গোলের সুযোগ পেয়েও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি ব্রাজিল। বদলি হিসেবে নামা এন্ড্রিক সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। এছাড়া মার্টিনেল্লি, ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং ব্রুনো গুইমারেসও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে নরওয়ের গোলরক্ষক নাইলান্ড কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে দলের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৫. বদলি খেলোয়াড় নামানোর সিদ্ধান্ত
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রুনো গুইমারেসকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার পর মাঝমাঠে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে ব্রাজিল। অথচ অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরো পুরো ম্যাচ খেলেন। এছাড়া ম্যাথিয়াস কুনার পরিবর্তে এন্ড্রিককে নামানোর সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি। এন্ড্রিকের মিস করা সহজ সুযোগটি শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের জন্য বড় আক্ষেপ হয়ে থাকে।
৬. কৌশলগত পরিকল্পনার ব্যর্থতা
নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিল তুলনামূলক রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে মাঠে নামে এবং প্রতিপক্ষকে বলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। পুরো ম্যাচে তাদের বল দখল ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যেখানে নরওয়ের দখলে ছিল ৬৬ শতাংশ বল। আগের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখলেও নরওয়ের বিপক্ষে সেই পরিকল্পনা বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত এই কৌশলই ব্রাজিলের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে ব্রাজিলের বিদায় কোনো একক কারণে নয়; বরং একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত, মাঝমাঠের দুর্বলতা, সুযোগ নষ্ট এবং কৌশলগত ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা দলটির এই পরাজয় ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও দল গঠন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
