
মো শাহাদাত হোসেন তালুকদার সাকু
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ফল হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তথ্যের ঘাটতি, প্রশাসনিক ধীরগতি ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রশাসনের একটি অংশ বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।
পেট্রোবাংলার আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১১৯টি গ্যাসকূপ ও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ২৬২ দশমিক ২ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ বিদ্যমান সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে প্রশ্ন
মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফ। এর মধ্যে এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফ এবং সামিটের ৫০০ এমএমসিএফ।
তবে চলতি জুলাই ও আগস্টে দুটি টার্মিনাল থেকে দৈনিক গড়ে ৫০০ থেকে ৭৫০ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। পরে ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত এলএনজি মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ শূন্যে নেমে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সামিটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন সময়মতো এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করা হয়নি এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি কেন তৈরি হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংকটের মধ্যেও স্থায়ী ব্যয়
টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও এর কিছু স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্সিলারেটের একটি টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় থাকাকালে বাংলাদেশকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ডলার স্থির ফি দিতে হয়েছে। এতে সরবরাহ না থাকলেও রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়গুলোতে নিরপেক্ষ অডিটের দাবি জোরালো হচ্ছে।
প্রশাসনিক বিলম্বের অভিযোগ
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে না পৌঁছানো এবং জরুরি এলএনজি কার্গো অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল আলমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে যে অসচ্ছতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন স্পষ্ট। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট খাতে দীর্ঘদিন সুবিধা নেওয়া একটি শ্রেণি নিষ্ক্রিয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতার মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা প্রমাণিত তথ্য প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, গত এক দশকে দেশে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা করা হয়েছে। ফলে আমদানিনির্ভরতার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে সেটিই বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁর মতে, টার্মিনালের প্রকৃত সক্ষমতা ও কারিগরি সমস্যার তথ্যও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সংকটও বড় কারণ
তবে বিদ্যমান সংকটে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ ও দামের পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশকে বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কাতারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের ব্যয়ও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংকটকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও তথ্যের অস্বচ্ছতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
নিরপেক্ষ অডিটের দাবি
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি এবং প্রকৃত উৎপাদন-সরবরাহের তথ্য নিরপেক্ষভাবে অডিট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে ‘অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র’, ‘সাবোটাজ’ বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
দৈনিক শীর্ষ অপরাধের জন্য প্রস্তাবিত শিরোনাম:
“বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে শুধু বিশ্ববাজার নয়, উঠছে অভ্যন্তরীণ কারসাজির অভিযোগ”
