
লাইফস্টাইল ডেস্ক: আধুনিক জীবনযাত্রায় ফ্যাটি লিভার বা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার সমস্যা ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, ডায়াবেটিস ও বিপাকীয় নানা সমস্যার সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি খাবার বা পানীয়কে ‘জাদুকরী সমাধান’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ ক্ষেত্রে বিটরুটের জুস নিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা থাকলেও বিষয়টি একটু ভিন্ন। বিটে থাকা নাইট্রেট, বেটালাইন ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে বিটের নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তপ্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিটের জুস ফ্যাটি লিভারের জমে থাকা চর্বি সরাসরি গলিয়ে দেয়—এমন শক্ত প্রমাণ নেই। তাই চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে শুধু বিটের জুসের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
বেটালাইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভূমিকা
বিটরুটের উজ্জ্বল লাল রঙের জন্য মূলত দায়ী বেটালাইন নামের রঞ্জক উপাদান। এগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কোনো খাবারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকলেই সেটি লিভারের রোগ সারিয়ে ফেলবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বিটের জুস কি লিভার এনজাইম কমায়?
বিটরুট ও এর বিভিন্ন উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং প্রাণী ও সীমিত মানব গবেষণায় কিছু সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত সবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিটের জুস পান করলে ALT বা AST নাটকীয়ভাবে কমে যাবে—এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই।
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সুষম খাবার এবং ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের মতো সংশ্লিষ্ট রোগ নিয়ন্ত্রণ।
লেবু ও আদা মেশালে কী হয়?
বিটের জুসের সঙ্গে সামান্য লেবু বা আদা যোগ করলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। লেবুতে ভিটামিন সি রয়েছে, যা উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শোষণে সহায়তা করে। আদায়ও বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে।
তবে বিট, লেবু ও আদার মিশ্রণ লিভারের জমে থাকা চর্বি গলিয়ে শরীর থেকে বের করে দেয়—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। একইভাবে এই পানীয় স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে কমায়—এমন দাবিও করা উচিত নয়।
কারা সতর্ক থাকবেন?
বিটরুটে অক্সালেট রয়েছে। যাদের আগে ক্যালসিয়াম-অক্সালেট কিডনি স্টোন হয়েছে, তাদের বেশি পরিমাণ বিট খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া বিটে থাকা নাইট্রেট রক্তচাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই যারা রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করেন এবং যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তাদের অতিরিক্ত বিটের জুস পান না করাই ভালো।
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও জুসের পরিবর্তে পুরো বিট খাওয়া তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে, কারণ পুরো সবজিতে আঁশ থাকে। জুস তৈরির সময় সেই আঁশের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
ফ্যাটি লিভার কমাতে আসল করণীয়
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা
- কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি কমানো
- ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা
- শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো
- ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ফ্যাটি লিভার থাকলে শুধু কোনো একটি পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখা জরুরি—বিটের জুস একটি পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি ফ্যাটি লিভারের ওষুধ নয়। লিভারে চর্বি জমার কারণ ও মাত্রা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
