মো. হাসান, বান্দরবান প্রতিনিধি:
বান্দরবানে পর্নোগ্রাফি আইনে দায়ের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে জোরপূর্বক আপসের চেষ্টা, থানায় চাপ প্রয়োগ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পক্ষ ও পুলিশের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী নারী হাসিনা আক্তার (৫০), যিনি বান্দরবান জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক, অভিযোগ করেন—গত ১৮ ডিসেম্বর তার ছোট মেয়ে সাদিয়া খান টুম্পা (২৬) ও জামাতা মিসকাতুন নবী মিসকাত (২৭) একটি আপত্তিকর ভিডিও দেখিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন এবং ৩ লাখ টাকা দাবি করেন।
এ ঘটনায় তিনি বান্দরবান সদর থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযুক্তদের আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তীতে তারা জামিনে মুক্ত হয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হাসিনা আক্তার জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি গত ২৫ এপ্রিল পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। একই দিনে অভিযুক্ত মিসকাতুন নবী মিসকাত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন।
থানায় না যাওয়ায় উত্তেজনা, বাড়ি ঘেরাওয়ের অভিযোগ
ভুক্তভোগী ও তার ছেলে মো. রায়হান উদ্দিন রাজের দাবি, পাল্টা অভিযোগের পর পুলিশের একটি দল তাদের বাড়িতে গিয়ে আপসের বিষয়ে আলোচনা করে এবং পরদিন থানায় যেতে বলে। তবে নিরাপত্তা শঙ্কায় তারা থানায় যাননি।
তাদের অভিযোগ, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ২৭ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান নেয়। এ সময় দরজা ভেঙে প্রবেশের চেষ্টাও করা হয় বলে তারা দাবি করেন। যদিও কাউকে আটক না করেই পুলিশ ফিরে যায়।
থানায় গেলে ‘আপস চাপ’ ও টাকার শর্ত
পরদিন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে থানায় গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন হাসিনা আক্তার। তার দাবি, থানায় নিয়ে তাকে মামলার আপস করতে চাপ দেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “আমি কোনো আপস করতে চাইনি। আমাকে চাপ দিয়ে সই নেওয়া হয়েছে। এমনকি পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্যও একটি কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার নিজস্ব অর্থে নির্মিত একটি কক্ষ ছেড়ে দেওয়ার শর্তে আসামিপক্ষকে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়।
আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন
হাসিনা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে এবং বাকি ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই লেনদেন স্বেচ্ছায় হয়েছে নাকি চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংরক্ষিত মহিলা সদস্য কুলছুমা বেগম বলেন, “থানায় তাকে কিছু সময়ের জন্য রাখা হয়েছিল। আমরা বুঝিয়ে তাকে বের করে আনি। আপসের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন।”
অন্যদিকে, ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুর ছবুর এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পুলিশের বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার করে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহেদ পারভেজ বলেন,
“তাকে আটক করা হয়নি এবং কোনো আপসও করানো হয়নি। মামলাটি আদালতে চলমান—এ বিষয়ে থানার কোনো এখতিয়ার নেই।”
জেলা পুলিশ সুপার আবদুর রহমান জানান,
“ঘটনাটি সম্পর্কে আগে অবগত ছিলাম না, কিছুক্ষণ আগে জেনেছি। জামাইকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগে ৯৯৯-এ কল করা হয়। সেই প্রেক্ষিতে উভয় পক্ষকে চেয়ারম্যানসহ থানায় ডাকা হয়েছিল। কাউকে আটক রাখা হয়নি।”
