বাংলাদেশে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। বাজার, দোকান, শপিংমল কিংবা অনলাইন—সব জায়গাতেই লেনদেন চলছে অবিরাম। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্য প্রকাশ করা থাকে না। ফলে ক্রেতারা অনেক সময় প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞাত থেকে প্রতারিত হন। এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে প্রতিটি পণ্যের মূল্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বর্তমানে দেশের বহু দোকান ও বাজারে পণ্যের গায়ে বা তাকের সামনে কোনো মূল্য তালিকা থাকে না। এতে করে বিক্রেতারা সুযোগ বুঝে একেক ক্রেতার কাছে একেক রকম দাম দাবি করেন। কোনো পণ্যের প্রকৃত মূল্য যদি ১০০ টাকা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সেই পণ্যের দাম ২০০ বা ৫০০ টাকা পর্যন্ত বলা হয়। এমনকি কোথাও কোথাও কয়েক গুণ বেশি দাম চাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাজারে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
মূল্য প্রকাশ না থাকার কারণে দরদাম বা মুলামুলির সংস্কৃতিও বেড়ে যাচ্ছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিরও জন্ম নেয়। অন্যদিকে, সৎ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত লাভ করে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে প্রতিটি পণ্যের নির্ধারিত মূল্য স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। দোকানের তাক, পণ্যের মোড়ক কিংবা ডিজিটাল বোর্ডে মূল্য তালিকা প্রকাশ করা থাকে। ফলে ক্রেতা সহজেই বুঝতে পারেন তিনি কত দামে পণ্য কিনছেন। এতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং প্রতারণার সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ দেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। ইসলাম ধর্মে ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রেতাকে প্রতারণা করা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করা কিংবা অতিরিক্ত দাম নেওয়া ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই এ ধরনের প্রতারণা শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধেই নয়, বরং এটি ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদারও লঙ্ঘন। বলা যায়, এটি এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল, কারণ ন্যায্য দামে পণ্য ক্রয়ের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি দোকান, বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার, রেস্তোরাঁ এবং অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রেও পণ্যের মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত বাজার তদারকি করতে হবে এবং যারা মূল্য তালিকা প্রকাশ করবে না বা অতিরিক্ত দাম নেবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। ক্রেতাদের উচিত মূল্য তালিকা দেখতে চাওয়া এবং অতিরিক্ত দাম দাবি করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। এতে ধীরে ধীরে বাজারে একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ বাণিজ্য পরিবেশ গড়ে উঠবে।
সর্বোপরি বলা যায়, পণ্যের মূল্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা শুধু ভোক্তা সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি একটি ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার পূর্বশর্ত। তাই দেশের স্বার্থে এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য দ্রুত কার্যকর আইন ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যের মূল্য প্রকাশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
দেশ স্বাধীন এর ৫৫ বছর অতিবাহিত হলেও প্রতারনা ঠেকাতে সরকারিভাবে আজও পর্যন্ত কোন সরকারই এ বিষয় পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে প্রতারণা দিন দিন বেড়েই চলছে। বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। এই সরকার কেই এ বিষয় পদক্ষেপ নিতে হবে।পাশাপাশি জনগনকে প্রতিবাদি হয়ে যার যার এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

