• রবি. জুন ১৪, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা: তারেক রহমানের নীতি-রাজনীতি ও বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

Byadmin

মে ৯, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে-নির্বাচনী ইশতিহার কি কেবল প্রচারণার ভাষণ, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব নীতিমালা? সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এর ঘোষিত নির্বাচনী অঙ্গীকার ও তার বাস্তবায়নের উদ্যোগ এই প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক কৌশলের সমন্বয়ে গঠিত এই কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ের পর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে-যেমন খাল খনন কর্মসূচি, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা (ফ্যামিলি কার্ড), ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য ভাতা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি-তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনী ইশতিহার ও বাস্তবায়নের রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনী ইশতিহার অনেক সময় প্রতীকী নথি হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-নির্বাচনী অঙ্গীকারকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা। তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক “নীতিনির্ভর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা”- এর দিকে একটি ধাপ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রদর্শন করা-এই দুই লক্ষ্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে: রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল ক্ষমতা অর্জনের প্রশ্ন নয়, বরং জনগণের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার পূরণের বিষয়।মূল আকর্ষণ: তারেক রহমানের ‘৩১ দফা’-একটি ভিশনারি বাংলাদেশ বিষয় প্রতিশ্রুতি ও মূল পরিকল্পনা এবং এর প্রত্যাশিত সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

১. ক্ষমতা কাঠামো: দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বৈরতন্ত্রের পথ বন্ধ করা।

২. সামাজিক নিরাপত্তা: ‘ফ্যামিলি কার্ড’: প্রতিটি নিম্নবিত্ত পরিবারকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর নিশ্চয়তা। দারিদ্র্য বিমোচন ও তৃণমূল মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা

৩. গ্রামীণ অর্থনীতি: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। ‘খাল খনন’: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেচ ব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিরসন।

৪. ধর্মীয় ও সামাজিক সংহতি: ধর্মীয় ভাতা ও সকল ধর্মের মানুষের জন্য সমঅধিকার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন।

৫. তরুণ ও কর্মসংস্থান: বেকারত্ব দূরীকরণ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ। দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা ও আইটি সেক্টরে বিনিয়োগ।

৬. বিচার বিভাগ: স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা। জনগণের ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা।
তারেক রহমানের নতুন রাজনীতি ও রাজনীতিতে নতুন ঘরানা: বিরোধী শিবিরের সাথে তুলনা: তারেক রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি পর্যলোচনা করলে দেখা যাচ্ছে বিরোধী দলের মনোভাব, নেতিবাচক সমালোচনা এবং রাজপথের আন্দোলন ভিত্তিক পক্ষান্তরে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি পলিসি-ভিত্তিক এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনায় সমুজ্জ্বল। যদি জনসম্পৃক্ততা ইস্যুকে আলোচনায় আনি তবে বিরোধী দলের তৎপররতা দলীয় এজেন্ডা ও ক্ষমতার কেন্দ্রিক। অন্যদিকে ফ্যামিলি ‘কার্ড’ ও ‘খাল খনন’-এর মতো সাধারণ মানুষের চাহিদাকেন্দ্রিক কর্মসূচি রয়েছে তারেক রহমানের। আমরা ভবিষ্যতের পরিকল্পনাতে বিরোধী দলের মনোভাব দেখতে পাচ্ছি অনির্দিষ্ট এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ। কিন্ত তারেক রহমানের ৩১ দফায় দেওয়া ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী এবং বাস্তবসম্মত ব্লু-প্রিন্ট। ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের সরকার ও বিরোধীদের আলোচনা-সমালোচনার নির্যাস এমনটাই প্রতিভাত হয়।খাল খনন কর্মসূচি: পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার: বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও গত কয়েক দশকে খাল ও জলপথ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে জলাবদ্ধতা, সেচ সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার সমস্যা তৈরি হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে যে লক্ষ্যগুলো অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে তা হলো- কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নতি, জলাবদ্ধতা হ্রাস, মৎস্য সম্পদের পুনরুদ্ধার, গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রকল্পগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু কৃষি উৎপাদনই বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-পরিবেশ ও উন্নয়নকে একসাথে বিবেচনা করা। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রবণতা।

ফ্যামিলি কার্ড: সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার নতুন মডেল পরিবারভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা বা ফ্যামিলি কার্ড ধারণাটি মূলত দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করার একটি পদ্ধতি। এই ধরনের কর্মসূচির কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে- দরিদ্র পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, সরকারের সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাতা: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালন করে। ইমাম, মসজিদের খাদেম বা ধর্মীয় শিক্ষকদের জন্য ভাতা চালু করার উদ্যোগকে অনেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেখছেন। এই উদ্যোগের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় নেতৃত্বকে সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, গ্রামীণ সমাজে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করা। তবে এই ধরনের নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো এবং সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

রাজনৈতিক কৌশল ও বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতা তারেক রহমানের নীতিগত কর্মসূচিগুলো শুধু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নয়; এগুলো একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। রাজনীতিতে সাধারণত তিনটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ- নীতি (policy), নেতৃত্ব (leadership), জনগণের আস্থা (public trust)। এই তিনটি উপাদান একসাথে কাজ করলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচির কারণে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও নতুন নীতি ও বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আসতে হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন ধীরে ধীরে নীতিনির্ভর রাজনীতির দিকে অগ্রসরে তারেক রহমানের চিন্তা বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সঞ্চারিত হতে বাধ্য হচ্ছে।শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর-প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বড় আকারের সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। তাই এই কর্মসূচিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন- শক্তিশালী প্রশাসনিক তদারকি, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন যদি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এই ধারা ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তনের কয়েকটি সম্ভাব্য দিক হলো- প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, নীতিনির্ভর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা শক্তিশালী হওয়া। ফলত: এটি দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শক্তিশালী করতে পারে।

ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক বার্তা তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যদি উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মধ্যে সঠিক সমন্বয় তৈরি করা যায়, তাহলে এই কর্মসূচিগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন শাসন মডেল তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ইশতিহারকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। খাল খনন কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাতার মত সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগগুলো কেবল প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক দর্শনের অংশ। যদি এই কর্মসূচিগুলো দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে ব্যবস্থাপনা শাষে একটি কথা আছে, তা হলো সঠিক ব্যক্তির হাতে সঠিক দায়িত্ব, এবং সাথে পূর্ণ কর্তৃত্ব ও আস্থা না থাকলে তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চয়তার লক্ষ্যে তারেক রহমানের গৃহীত কর্মসূচিগুলো দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।এই সংস্কার এজেন্ডা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও বিএনপির নীতি, আদর্শ ও দর্শনের প্রতি দায়বদ্ধ যোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি “Appointment Searching Authority” গঠন করা যেতে পারে। এই সংস্থার সুপারিশক্রমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চূড়ান্ত নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এতে করে বিচ্ছিন্নভাবে যোগ্য লোক না খুঁজে একটি সুনির্দিষ্ট ও সিস্টেমেটিক পদ্ধতিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে, যা সরকারের নীতি নির্ধারণ ও তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার এই ধারা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেয়- রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার লড়াই, নাকি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের একটি দায়বদ্ধ প্রক্রিয়া? বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতিকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং একটি ভিশনারি বা দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি চিন্তা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন রাজনীতিকে ‘কঠিন’ করার কথা বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মেধা, যোগ্যতা এবং দেশপ্রেমের মাপকাঠিতে রাজনীতিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যেখানে সুবিধাবাদীদের স্থান হবে না। বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও এখন সত্যিকার অর্থেই দেশের জন্য কাজ করতে হবে এবং সরকারের জনবান্ধব সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সকল কার্যক্রমগুলোকে বাধাগ্রস্ত না করা যুক্তিসঙ্গত হবে।

সকল দলের জন্য সেই দর্শনকে আরও আধুনিক ও জনসম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে নিচের কৌশলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে:

১. মেধাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি (Visionary Leadership):

ছায়া সরকার ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল: প্রতিটি খাতের (যেমন: অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি) জন্য নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা। এতে জনগণের কাছে পরিষ্কার হবে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী দলের কাছে দক্ষ জনবল ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্তকরণ: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে তরুণদের আইটি দক্ষতা ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার রূপরেখা প্রদান করা।

২. জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি (Grassroots Engagement)

সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ: শুধু মিছিল-মিটিং নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, চিকিৎসা) সমাধানে সামাজিক উদ্যোগ বাড়ানো।

সুশাসন ও ইনসাফ: গত ১৫ বছরে মানুষ যে প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে একটি ‘মেরিট-বেজড’ বা মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা।

৩. ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ বছরের ‘ক্ষতিপূরণ’

রোডম্যাপ: বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতি হয়েছে, তা সংস্কারে একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘ন্যাশনাল রিকভারি প্ল্যান’ থাকা জরুরি।

বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের স্বাধীনতা: দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ করার আইনি কাঠামো তৈরি।

অর্থনৈতিক সংস্কার: পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর অঙ্গীকার।

৪. “Do No Harm” বা অহিংস রাজনীতির চর্চা:

রাজনীতিতে প্রতিহিংসা দূর করে ‘জাতীয় ঐক্য’ বা ‘National Consensus’ গড়ে তোলার ডাক দেওয়া। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি হবে যে, পরিবর্তন মানেই বিশৃঙ্খলা নয়, বরং স্থিতিশীলতা।
জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক ঐক্য: অনৈক্যের সুরাহা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জাতীয় রাজনীতিতে এখন প্রধান ঐক্যের অনুসংগ। কিন্তু স্বাক্ষরিত জুলাই সনদপত্র, বিএনপি’র নোট অব ডিসেন্ট এবং নির্বাচিত দলের বাস্তবায়ন অঙ্গীকার ও গণভোটের আদেশের মধ্যে মতবিরোধ ঐক্যের পথে বাধা। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্য এখন সময়ের দাবি। বিএনপি’র ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এবং গণভোটের দাবির মতো দ্বিমতগুলোকে সংঘাতের বিষয় না বানিয়ে জাতীয় সংসদের টেবিলে সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদপত্র, বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট, গণভোটের আদেশ এবং নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের বাস্তবায়ন অঙ্গীকারকে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সমাধানের জন্য প্রয়োজন সর্বদলীয় সংলাপ, সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং একটি নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন কমিশন গঠন, যেখানে সরকার, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জনগণের মতামতকে চূড়ান্ত বৈধতা দেওয়ার জন্যে সংসদে ঐক্যমত্য তৈরিতে জনগণের আগ্রহ আছে।

সতর্কতা: রাজনৈতিক অনৈক্য অব্যাহত থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্ষয় ত্বরান্বিত হতে পারে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা এবং গণসম্মতি অর্জনের নিমিত্ত জাতীয় সংসদে এর দ্রুত সমাধান এখন জরুরি।

ব্যর্থতার পরিণাম: এত রক্ত ক্ষয়ের পর যদি রাজনৈতিক দলগুলো এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হয়, তবে দ্বন্দ্বের বেড়াজালে নিষিদ্ধ ফ্যাসিষ্ট গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ও প্রতিবিপ্লবের ঝুঁকি প্রবল হবে। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত সার্থক করতে হলে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র সংস্কারের এই সনদকে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য। একে কোন ভাবেই রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো যাবে না।

পরিশেষে বলা যায় যে, জাতীয় ঐক্য সুসংহত করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গৃহীত রাজনৈতিক ভিশনগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান’-এর মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা যায়, তবে তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা নয়, বরং বাংলাদেশের হারানো সম্ভাবনাগুলো পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বলা হয়ে থাকে সিঙ্গাপুরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সম্ভাবনাময় ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আজ জীবিকার তাগিদে সিঙ্গাপুরে ছুটতে হয় আমাদের যুবকদের। কেন? তার উত্তর তারেক রহমানের নীতি-রাজনীতি ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত আছে।

লেখক :

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অতিরিক্ত আইজিপি

বাংলাদেশ পুলিশ।

By admin

Editor And Publisher at Doinik Shirso Aparadh, Motijheel, Dhaka-1000.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights