নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মাদারীপুরের যুবক মো. সোহেল। হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলা, হাত-পা বেঁধে নগ্ন করে স্টিলের পাইপ ও ভাঙা কাচ দিয়ে পিঠ কেটে রক্তাক্ত করার মতো পৈশাচিক বর্বরতা চালানো হয়েছে তার ওপর। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারকে পাঠিয়ে দফায় দফায় আদায় করা হয়েছে মুক্তিপণ। অবশেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সোমবার (২৫ মে) দেশে ফিরেছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব লোমহর্ষক তথ্য জানানো হয়।
বৈধ ভিসার নামে ফাঁদ ও ৫ দেশের রুট
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ইতালি প্রবাসী রিয়াজুল মাতবর নামের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে বৈধ ভিসায় ইতালি যাওয়ার চুক্তিতে দেশ ছাড়েন সোহেল। দালালের সাথে মোট ২৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথমে ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা ইতালি পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।
টাকা নেওয়ার পর দালাল চক্র সোহেলকে সরাসরি ইউরোপ না নিয়ে রুট পরিবর্তন করতে থাকে। প্রথমে ভারতের চেন্নাই, এরপর পর্যায়ক্রমে শ্রীলঙ্কা, দুবাই ও মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে তাকে লিবিয়ার বেনগাজিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয় ত্রিপলিতে।
‘টর্চার সেলে’ বাঙালি জল্লাদ
ভুক্তভোগী সোহেল সংবাদ সম্মেলনে জানান, ত্রিপলির একটি বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, লিবিয়ার মাটিতে তাকে নির্যাতনকারী অপরহণকারীরা সবাই ছিলেন বাংলাদেশেরই নাগরিক (বাঙালি)।
লিবিয়ার আরেকটি চক্র তাকে জিম্মি করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ছেলেকে বাঁচাতে পরিবার জমি-জমা বিক্রি ও ধারদেনা করে ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করে। সব মিলিয়ে ইতালি যাওয়ার চুক্তি ও মুক্তিপণ বাবদ সোহেলের পরিবারের প্রায় ৬৩ লাখ টাকা খোয়া গেছে।
দেশে ৩ জন গ্রেপ্তার, নেপথ্যে ‘রাঘব বোয়াল’
পিবিআই-এর অতিরিক্ত উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, এই ঘটনায় রাজধানীর তুরাগ থানায় মামলা দায়েরের পর তদন্তে নামে পিবিআই। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকারিয়া আলম গত ২১ এপ্রিল দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— ম্যানেজার টিটু ওরফে টিটু ঢালী, রহিমা বেগম ও ইসমাইল দেওয়ান।
বাংলাদেশে চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর লিবিয়ায় থাকা অপহরণকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সোহেলকে ত্রিপলি বিমানবন্দর এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ইতিমধ্যেই সোহেল আদালতে নিজের জবানবন্দি দিয়েছেন।
পাচার চক্রের পেছনে প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে উল্লেখ করে পিবিআই কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতদের যেভাবে জামিন করানোর চেষ্টা চলছে, তাতে স্পষ্ট যে এই চক্রের পেছনে বড় বড় ‘রাঘব বোয়াল’ জড়িত। তদন্তে তাদের নামও বেরিয়ে আসছে।”
