সমরেশ রায় ও শম্পা দাস:
কলকাতা, ১৮ ডিসেম্বর:
আন্তর্জাতিক সংখ্যালঘু অধিকার দিবস এবং সংখ্যালঘু মঞ্চের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দুপুর ঠিক ১২টায় কলকাতার ঐতিহাসিক রানী রাসমণি রোড সংযোগস্থলে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজ্য সভাপতি ওয়ায়েজুল হকের নেতৃত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে “ধর্মতলা চলো” আহ্বান জানিয়ে বারো দফা দাবির ভিত্তিতে প্রতিবাদ সভা ও ডেপুটেশন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী ও সুবক্তা স্নেহাশিস চক্রবর্তী, যিনি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংখ্যালঘু মঞ্চের রাজ্য সভাপতি ওয়ায়েজুল হক, প্রতিষ্ঠাতা তানভীর আহমেদ, মেহেবুল হাসান, জিয়াবুল রহমান, চার্চের বিশপ শ্রীকান্ত দাস, রোহিত সাহাসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সভার সূচনা হয় তানভীর আহমেদের আবৃত্তি এবং মেহেবুল হাসানের গজল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। পরে মঞ্চে উপস্থিত অতিথিদের উত্তরীয় ও পুষ্পস্তবক প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। একই সঙ্গে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। এ বছর সংখ্যালঘু মঞ্চের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়।
সভায় বক্তারা একের পর এক নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়ালের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার খর্ব করার ষড়যন্ত্র চলছে। বক্তাদের ভাষায়, “নির্বাচন কমিশনার বিজেপির দালাল ও এজেন্টের ভূমিকা পালন করছেন। আগুন নিয়ে খেলছেন—এখনো সময় আছে সাবধান হোন। সংখ্যালঘুদের নিয়ে ইচ্ছেমতো ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।”
বক্তারা ধর্ম ও রাজনীতির অপব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়। রাজনীতির কাজ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের অধিকার আদায় করা।”
রানী রাসমণি রোডে এদিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সংখ্যালঘু সংগঠনের কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হন। মাদল ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সভাস্থল উৎসবমুখর হলেও মূল সুর ছিল প্রতিবাদের।
বক্তারা ওয়াকফ সম্পত্তি প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে বলেন, “ওয়াকফ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জন্মগত অধিকার। এক বিন্দু জমিও আমরা ছাড়বো না। এই সম্পত্তি কারো দয়া বা দানের ফল নয়।”
গীতা পাঠের দিন বাংলায় এক মুসলিম প্যাটিস ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনারও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি অভিযোগ তোলা হয়, পরিকল্পিতভাবে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ভোটার কার্ড বাতিল করা হচ্ছে—যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
সভায় আরও অভিযোগ করা হয়, কেন্দ্রীয় সরকার আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করলেও নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়াল তা ভোটার তালিকায় মান্যতা দেননি। কেন আধার কার্ডের বৈধতা অস্বীকার করা হচ্ছে, তার জবাব দাবি করেন বক্তারা।
ওবিসি তালিকা থেকে একের পর এক গোষ্ঠীর নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকেও ‘ছেলেখেলা’ বলে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। পাশাপাশি এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেছে বেছে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
বিহারে এক চিকিৎসাশিক্ষার্থী ছাত্রীকে হিজাব খুলতে বাধ্য করার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, “সংবিধান নারীকে হিজাব পরার অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার লঙ্ঘনের জবাব নীতিশ কুমারকে দিতে হবে।”
বক্তারা একযোগে বলেন, “একদিকে নির্বাচন কমিশনার বিজেপির দালালি করছেন, অন্যদিকে নীতিশ কুমার মহিলাদের অসম্মান করছেন—এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ চলবে।”
সভা শেষে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে একটি মিছিল নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যারিকেড ও বাধা দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা তা ভেঙে ডোরিনা ক্রসিং হয়ে এগিয়ে যান। এ সময় সাময়িক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলেও মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে এগোতে থাকে।
পরবর্তীতে লেনিন মূর্তির কাছে পৌঁছালে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পুলিশের গাড়িতে করে নির্বাচন কমিশনে ডেপুটেশন দিতে যান। প্রতিনিধি দল ফিরে না আসা পর্যন্ত অন্যান্য আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং স্পষ্ট জানান—সঠিক জবাব না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বক্তারা শেষ বক্তব্যে বলেন, “ভারতবর্ষ কোনো একক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের দেশ নয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলিত রক্তে এই দেশ গড়ে উঠেছে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে দমন করা যাবে না।”
রিপোর্টার: সমরেশ রায় ও শম্পা দাস
স্থান: কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
দৈনিক: শীর্ষ অপরাধ
