
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নতুন নীতি গ্রহণ নয়, বরং সেই নীতির দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পকারখানা সচল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে একই সঙ্গে একাধিক фрон্টে কাজ করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি শক্তিশালী, উৎপাদনমুখী ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের যে লক্ষ্য সামনে এনেছেন, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে জনগণের উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’—নিজের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছিলেন তারেক রহমান। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও উদ্যোগে সেই স্বপ্নের অর্থনৈতিক রূপরেখাও স্পষ্ট হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। দেশের উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল।
উদ্যোক্তার আস্থা ফেরানো বড় চ্যালেঞ্জ
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দেশীয় উদ্যোক্তারা যদি নিজেদের অর্থ দেশে বিনিয়োগে নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ, প্রশাসনিক দক্ষতা, করব্যবস্থা এবং ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশ বিবেচনা করেন। তাই বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দেশের বেসরকারি খাত এখনো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাবের ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে মামলা, প্রশাসনিক জটিলতা, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্দেশনা আছে, বাস্তবায়ন কতটা?
বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন ইতিবাচক নির্দেশনা দেওয়া হলেও প্রশ্ন উঠছে—এসব নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে?
নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ব্যবসাবান্ধব বার্তা দেওয়া হলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘসূত্রতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি কিংবা সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারের নীতির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করার উদ্যোগ
অর্থনীতি সচল রাখতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা চালু হলে শুধু উৎপাদনই বাড়ে না; এর সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, সরবরাহকারীদের ব্যবসা এবং সরকারের রাজস্ব—সবকিছুই সক্রিয় হয়।
সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্ব দিলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, মালিকানা-সংক্রান্ত সমস্যা, ব্যাংক ঋণ, অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না, নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
নিরাপত্তাহীনতায় বিনিয়োগ থমকে যেতে পারে
বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত নিরাপত্তা। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা যদি প্রতিষ্ঠান, সম্পদ ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস, মব-সহিংসতা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার নিয়েও উদ্বেগ
ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ, কুৎসা ও চরিত্রহননের প্রচারণা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আবার অর্থ দাবি করে তা না পেলে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কারণ মিথ্যা তথ্য যেমন একজন উদ্যোক্তার সুনাম নষ্ট করতে পারে, তেমনি প্রকৃত অনিয়ম থাকলে সেটিও আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
মামলা ও আইনি জটিলতায় ব্যবসা ব্যাহত
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি বন্ধ করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাতে অকারণে স্থবির না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একজন উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক কিংবা আইনি জটিলতায় থাকলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এতে শুধু উদ্যোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; কর্মচারী, ব্যাংক, সরবরাহকারী ও সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অর্থনৈতিক অবদান
উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে অর্থনীতিতে তাদের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একজন ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং রাষ্ট্রকে কর দিচ্ছেন—এটাই তার অর্থনৈতিক ভূমিকার মূল পরিচয়।
‘আমার লোক’ কিংবা ‘তোমার লোক’ বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন করলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে একটি সমান ও নিরপেক্ষ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জরুরি।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংক হিসাবের বিষয়
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদেশে যাতায়াত করতে হয়। আমদানি-রপ্তানি, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, নতুন বাজার অনুসন্ধান কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়িক ভ্রমণ অনেক সময় অপরিহার্য।
কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই দরকার। তবে দীর্ঘদিন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা ব্যাংক হিসাব স্থগিত থাকার কারণে যদি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার প্রভাব কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতেও পড়ে। তাই তদন্তের পাশাপাশি ব্যবসা সচল রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট বড় বাধা
শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানায় উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস বা বিদ্যুৎ না পাওয়া গেলে উৎপাদন কমে যায়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয় না এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে সমস্যার কথা বলে আসছে। শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো জরুরি
ব্যবসা শুরু করা, অনুমোদন নেওয়া, জমি ও ইউটিলিটি সংযোগ পাওয়া, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কর-ভ্যাটসংক্রান্ত কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের অন্যতম অভিযোগ।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যবসা সহজ করার নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে যদি পুরোনো পদ্ধতি ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থেকে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
সরকারি সেবাগুলোকে আরও বেশি ডিজিটাল, সময়সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করা হলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত হবে।
সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ
দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নানা কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে, কেউ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও বাজারসংকটের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সব প্রতিষ্ঠানকে এক নিয়মে দেখার পরিবর্তে যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব, সেগুলোকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে বন্ধ হয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান ফিরবে এবং ব্যাংকের অর্থও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
কর-ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের জন্য কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি কর ব্যবস্থার জটিলতার কারণে যেন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত না হয়, সেটিও দেখতে হবে।
ডিজিটাল করব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং হয়রানিমুক্ত সেবা ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়াতে পারে।
সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও বেসরকারি খাতকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার নীতি ও অবকাঠামো তৈরি করবে, আর উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন।
বিশ্বের অনেক সফল অর্থনীতির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ব্যবসার জন্য সরকারকে প্রতিটি ব্যবসায় সরাসরি অংশ নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হয় যেখানে উদ্যোক্তারা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারেন।
অদৃশ্য বাধা চিহ্নিত করাই এখন জরুরি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান। শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি এক ধরনের সিদ্ধান্ত আসে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেটি বাস্তবায়নে গড়িমসি হয়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের গতি বাধাগ্রস্ত হবে।
সরকারের অভ্যন্তরে যদি কোনো মহল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা দেখায়, উদ্যোক্তাদের আস্থা নষ্ট করে কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, তাহলে তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।
কারণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা বন্ধ থাকার অর্থ শত শত মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ থাকা। একটি নতুন বিনিয়োগ স্থগিত হওয়ার অর্থ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উৎপাদন ও রাজস্ব হারানো। একজন উদ্যোক্তা আস্থা হারালে তার সঙ্গে ভবিষ্যতের আরও অনেক বিনিয়োগের সম্ভাবনাও হারিয়ে যেতে পারে।
স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আস্থা
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অর্থের পাশাপাশি প্রয়োজন আস্থা, স্থিতিশীলতা, দক্ষ প্রশাসন এবং কার্যকর জবাবদিহি। বিনিয়োগকারীকে নিরাপত্তা দিতে হবে, শিল্পকে জ্বালানি দিতে হবে, ব্যবসাকে সহজ করতে হবে এবং ন্যায়সংগত আইনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশীয় উদ্যোক্তারা যখন বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের আকর্ষণ বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বাড়বে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে। এভাবেই অর্থনীতি একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে শুধু বক্তব্য, নির্দেশনা বা নীতিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং কোন স্তরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে—তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নীতি ও বাস্তবায়নের সমন্বয়ের ওপর। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে অদৃশ্য বাধাগুলো দৃশ্যমান করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। উদ্যোক্তার আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগের পথ সহজ করতে পারলেই শক্তিশালী, উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থানভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে পারে।
