• মঙ্গল. জুন ২, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

অলৌকিকতার নামে বাণিজ্য, অতঃপর দীঘিতে কুমিরের মুখ থেকে উদ্ধার ৭ বছরের ফাতেমার ক্ষতবিক্ষত লাশ!

ByShirso aparadh

জুন ২, ২০২৬

নাহিদা আক্তার লাকী:

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (র.) মাজারের দীঘি যেন এক মৃত্যুফাঁদ। অবশেষে ১০ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে দীঘির মহিলা ঘাটের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭ বছর বয়সী অবুঝ শিশু ফাতেমা আক্তারের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। শরীরে কুমিরের ধারালো দাঁতের গভীর ক্ষত নিয়ে ভেসে ওঠা এই নিষ্পাপ শিশুর লাশ যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—মাজারের তথাকথিত ‘অলৌকিক কুমির বাণিজ্য’ এবং প্রশাসনের চরম উদাসীনতা কীভাবে একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিল।

​এর আগে গতকাল সোমবার (১ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে দীঘির পূর্ব পাশের নারীঘাটে গোসল করতে নেমেছিল ফাতেমা। তখনই ওত পেতে থাকা বিশালাকার এক কুমির তাকে কামড়ে ধরে চোখের পলকে পানির নিচে নিয়ে যায়।

​লোক দেখানো ভীতি আর মাজারের অমানবিকতা

​ঘটনার সময় ঘাটে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শিশুটির বুকফাটা আর্তচিৎকার আর উপস্থিত লোকজনের হৈচৈ সত্ত্বেও দীঘিতে থাকা হিংস্র বন্য কুমিরের ভয়ে কেউ পানিতে নেমে শিশুটিকে বাঁচানোর সাহস পাননি। মাজারের নাম করে যারা বছরের পর বছর কোটি টাকা আয় করছে, সেই খাদেম বা সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে আপদকালীন কোনো লাইফগার্ড বা উদ্ধারকারী কর্মী ঘাটে মোতায়েন ছিল না। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ তৎপরতায় প্রায় ১০ ঘণ্টা পর ভোরে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘাটের এক স্থানীয় দোকানি বিনা ফকির জানান, উদ্ধারের পর দেখা গেছে শিশুটির শরীরের বেশ কয়েকটি স্থানে কুমিরের কামড়ের নৃশংস চিহ্ন রয়েছে।

​অন্ধবিশ্বাস ও ব্যবসার জাল: বলি হচ্ছে অসহায়রা

​খান জাহান আলী মাজারের এই দীঘি আর কুমিরকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে এক ধরনের পরিকল্পিত অন্ধবিশ্বাস ও কোটি টাকার বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কুমিরকে মুরগি খাওয়ানো, মানত করা আর আশীর্বাদ নেওয়ার নামে প্রতিবছর যে বিপুল অর্থ আসে, তার একটি বড় অংশ মাজারের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। অথচ, দীঘিতে মানুষখেকো বন্য কুমির থাকা সত্ত্বেও সাধারণ দর্শনার্থী, নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা বেষ্টনী (লোহার খাঁচা বা গ্রিল) তৈরি করা হয়নি।

​নিখোঁজ ও মৃত ফাতেমা মাজার এলাকাতেই ভবঘুরে হিসেবে থাকা এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর সন্তান। স্থানীয়দের অভিযোগ, অসহায় ও ছিন্নমূল হওয়ায় এই মা-মেয়ের নিরাপত্তার দিকে মাজার কর্তৃপক্ষের বিন্দুমাত্র নজর ছিল না। এমনকি মৃত্যুর পর মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম প্রশাসনকে সাথে নিয়ে দাফনের গৎবাঁধা আশ্বাস দিলেও, এই হত্যাকাণ্ডের দায় নিতে রাজি নন কেউই।

​প্রশাসনের ঠুঁটো জগন্নাথ ভূমিকা এবং ‘সতর্কতার’ তামাশা

​এই নির্মম ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন থেকে “শিশু ও নারীদের ঘাটে নামার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা” অবলম্বনের এক দায়সারা অনুরোধ জানানো হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে দীঘিতে হিংস্র বন্য প্রাণী মুক্ত অবস্থায় ঘুরছে, সেখানে প্রশাসন লোহার গ্রিল দিয়ে নিরাপদ গোসলখানা তৈরি না করে কেন দায় এড়ানোর জন্য কেবল ‘সতর্কবার্তা’ জারি করে তামাশা করছে? মাজারের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থের কাছে কি সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য এতই সস্তা?

​এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অলৌকিকতার আড়ালে এই বিপজ্জনক ব্যবসা ও মাজার কর্তৃপক্ষের মনগড়া আধিপত্য বন্ধ করতে হবে। ঘাটগুলোতে স্থায়ী লোহার বেষ্টনী নির্মাণ এবং শিশু ফাতেমার মৃত্যুর পেছনে মাজারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে এই দীঘি আগামীতে আরও বড় কোনো ট্র্যাজেডির কারণ হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights