
বরিশাল বিভাগীয় ব্যুরো
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ-বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার এবং প্রশাসনের একাধিক সূত্রে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে, যা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা পরিষদের একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪–২৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাকেরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হতো, যা ইউএনও রুমানা আফরোজের নামে আদায় করা হতো।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের আওতায় পরিচালিত সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পে ৫ শতাংশ, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পে ২ শতাংশ এবং এলজিইডির শিক্ষা অবকাঠামো প্রকল্পে আরও ২ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারদের দাবি, এসব অর্থ আদায়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় ব্যবহৃত হতো।
রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানান, কাবিখা প্রকল্পের তিন লাখ টাকার বিল তুলতে গিয়ে তাকে ৩৬ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন চরাদি, চরামদ্দি, কলসকাঠি ও গারুড়িয়া ইউনিয়নের একাধিক জনপ্রতিনিধি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দকৃত প্রায় ১০ লাখ টাকা সড়ক সংস্কার, ড্রেন পরিষ্কার ও ব্রিজ মেরামতের নামে ব্যয় দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজের বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
এছাড়া পরিত্যক্ত ঘোষিত ইউএনও বাসভবনের সামনের রাস্তা সংস্কারে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ভবনে বসবাস করলেও প্রায় ১৫ মাস কোনো ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি, যার পরিমাণ প্রায় দুই লাখ টাকার বেশি।
রুমানা আফরোজ পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ আরও তীব্র হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। পৌর এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ৫ শতাংশ ঘুষ ছাড়া বিল ছাড় হতো না বলে জানিয়েছেন ঠিকাদাররা। এমনকি জামানতের টাকা ফেরত নিতেও ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পৌরসভার এক প্রকৌশলী জানান, প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল পরিশোধে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে আদায় করা হয়েছে। এছাড়া কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, যেখানে কাগজে-কলমে উচ্চমানের উপকরণ দেখানো হলেও বাস্তবে নিম্নমানের কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ।
পৌরসভার একাধিক সূত্রের দাবি, দায়িত্ব ছাড়ার আগে তিনজন কর্মচারীকে পদোন্নতি দিতে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে মোট ছয় লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। পদোন্নতির তালিকায় স্বাস্থ্যকর্মী থেকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, অফিস সহকারী থেকে উচ্চমান সহকারী এবং উচ্চমান সহকারী থেকে হেড ক্লার্ক পদে উন্নীত করার অভিযোগ উঠেছে।
মহান বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের নামে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। ইটভাটা মালিক, মাছ ব্যবসায়ী, বালু ও মাটি ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই চাঁদা প্রদানে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
গারুড়িয়া ইউনিয়নের এক ইটভাটা মালিক জানান, দিবস এলেই ইউএনও কার্যালয় থেকে ফোন দিয়ে টাকা চাওয়া হতো এবং পরে অফিস স্টাফ পাঠিয়ে তা সংগ্রহ করা হতো।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে পাশ কাটিয়ে ইউএনও’র নির্দেশে অন্যদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঠিকাদারদের দাবি, নামমাত্র লাভ দিয়ে কাজ করিয়ে নিজের পছন্দের লোকদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হতো।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, তাদের বেতন উত্তোলনের সময়ও ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। এই অর্থ ইউএনও অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নেওয়া হতো বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রুমানা আফরোজের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তিনি বর্তমানে ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যুগ্মসচিব) মো. আহসান হাবিব বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাহ্যিকভাবে সৌজন্যপূর্ণ আচরণের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চালিয়ে গেছেন এই কর্মকর্তা। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বাকেরগঞ্জে সাবেক ইউএনও রুমানা আফরোজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/