১৬ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবের দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম আর কোটি মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পার হলেও আজ প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও জনগণ কি সত্যিকার অর্থে মুক্ত?
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল শোষণমুক্ত সমাজ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। অথচ স্বাধীনতার পর থেকেই সেই চেতনার সঙ্গে বাস্তবতার ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার লড়াই ও অপরাজনীতির বিষবৃক্ষ ক্রমে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, সাধারণ মানুষ আজও বঞ্চনা ও বৈষম্যের ভার বইছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে রাজনীতি আদর্শের পথ ছেড়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে প্রতিহিংসার যুদ্ধে। সরকার পরিবর্তন মানেই বিরোধী দমন, মামলা-হামলা, ভয়ভীতির সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি ভুক্তভোগী দেশের সাধারণ জনগণ।
একাত্তরে ভারতের সহযোগিতা ইতিহাসের বাস্তবতা হলেও স্বাধীনতার পর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বারবার উঠেছে ভারতীয় আধিপত্যের অভিযোগ। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্যসহ নানা ইস্যুতে দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম দিয়েছে। স্বাধীন দেশ হয়েও অনেক সময় পরনির্ভরশীলতার বোধ থেকে আমরা বের হতে পারিনি।
দেশের ভেতরে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস যেন এক নীরব শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এসব অপশক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবন পর্যন্ত জিম্মি করে রেখেছে। আইনের শাসন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি আজ জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। আয় বাড়েনি, কিন্তু চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমে নিম্নবিত্তে নেমে যাচ্ছে, আর দরিদ্র মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে হিমশিম খাচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও মানুষ যদি দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা না পায়, তবে সেই স্বাধীনতার সার্থকতা কোথায়?
স্বাস্থ্যখাত আজ সেবার বদলে অনেকাংশে বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও দালালচক্র, আর বেসরকারি হাসপাতালে আকাশচুম্বী ব্যয়—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা আজও বিলাসিতা। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক বাস্তবতা।
সরকারি চাকরিতে ঘুষ ও সুপারিশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ ও প্রভাব যেখানে নিয়ামক হয়ে ওঠে, সেখানে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক। এর ফলে মেধাবীরা হতাশ হচ্ছে, আর দুর্নীতির সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।
বেকারত্ব আরেকটি বড় জাতীয় সংকট। শিক্ষিত তরুণ সমাজ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ ও দিশেহারা। অনেকে বিদেশমুখী হচ্ছে, কেউ কেউ অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ছে। যে তরুণ সমাজ একদিন মুক্তিযুদ্ধে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই তরুণদের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব আরও গরিব। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প শোনা গেলেও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়নি। সামাজিক বৈষম্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিজয় দিবস তাই শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনার দিন। আজ আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি? যদি না পেরে থাকি, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার?
এই বিজয় দিবসে অঙ্গীকার হোক—অপরাজনীতি, দুর্নীতি, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার। রাষ্ট্রের প্রকৃত বিজয় তখনই আসবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সম্মান, ন্যায়বিচার ও মানবিক জীবনযাপনের অধিকার পাবে।
স্বাধীনতার চূড়ান্ত সার্থকতা তখনই, যখন জনগণ সত্যিকার অর্থে মুক্ত হবে।
