আমিনুল ইসলাম :
রাজধানীর পুরান ঢাকায় দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে একসময়ের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে। সোমবার (১০ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে এই ঘটনাটি ঘটে। তিনি সেদিন ২৮ বছর আগের জাহিদ আমিন ওরফে হিমেল হত্যা মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে এসেছিলেন।
আদালতে হাজিরা শেষে রক্তাক্ত পরিণতি
ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মমিনুন নেসারের আদালতে ওই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। তারিক সাইফ মামুন আদালতে হাজিরা দেন, তবে কোনো সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় আদালত আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেন। আদালত থেকে বেরিয়ে মামুন যান পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫১ মিনিটের দিকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসার পর হঠাৎ দৌড়ে পুনরায় ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সেই সময়ই দুই দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল থেকে নেমে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী মো. তারেক জানান, “দুইজন দুর্বৃত্ত হঠাৎ গুলি শুরু করে। প্রথম গুলি হাসপাতালে জানালায় লাগে, এরপর আরও পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায়। তিনটি গুলি মামুনের শরীরে লাগে।” গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভিক্ষুক না পার্কিং? রহস্যে ঘেরা শেষ মুহূর্ত
নিরাপত্তাকর্মীদের কেউ কেউ বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে একজন ভিক্ষুক মামুনের কাছে টাকা চাইলে তিনি কিছু দিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। আবার কেউ বলেন, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
তার আইনজীবী মেহেদী হাসান জানান, “মামুন আদালতে হাজিরা দিয়েছিলেন। সাক্ষী না আসায় নতুন তারিখ ধার্য হয়। এরপর তিনি চলে যান। কেন হাসপাতালে গিয়েছিলেন তা আমি জানি না।”
২৮ বছর পুরনো রক্তাক্ত অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং এলাকায় জাহিদ আমিন ওরফে হিমেলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় হিমেলের বন্ধু সাইদ আহত হন। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিক সাইফ মামুনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল হয়।
মুক্তি, হামলা ও শেষ পরিণতি
চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় কারাভোগের পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পান মামুন। মুক্তির মাত্র তিন মাস পরই তেজগাঁও বিজি প্রেস এলাকায় তার ওপর গুলিবর্ষণ হয়। সেসময় আইনজীবী ভুবন চন্দ্র শীল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। মামুন সে সময় দাবি করেছিলেন, ওই হামলার পেছনে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের হাত ছিল।
গত বছরের ৯ মে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় তারিক সাইফ মামুনসহ ছয়জনকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়। তবে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।
তারিক সাইফ মামুনের খালাতো ভাই হাফিজ বলেন, “আমার ভাই অনেক বছর ধরে শান্তিতে জীবনযাপন করছিল। কে বা কারা তাকে হত্যা করলো, আমরা জানি না।”
এক সময়ের ভয়ংকর সন্ত্রাসী থেকে আইনি লড়াইয়ে মুক্ত মানুষ—শেষ পর্যন্ত পুরান ঢাকার রাস্তায় রক্তাক্ত পরিণতি পেল তারিক সাইফ মামুনের জীবন।
