• বুধ. সেপ্টে ৯, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

ঘটনার অন্তরালের সত্য উদ্‌ঘাটনে

বিগত ১৮ বছরের মিথ্যা মামলার জাঁতাকল: ক্ষতিপূরণের দাবিতে দাউদকান্দি বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

BySarker

সেপ্টে ৯, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, দাউদকান্দি (কুমিল্লা):

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক ও মিথ্যা’ দাবি করে সেগুলো প্রত্যাহার, দীর্ঘদিনের হয়রানির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাস উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ১৮ বছর ধরে এসব মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মজীবন ব্যাহত হয়েছে; পরিবারেও নেমে এসেছে নানা ধরনের সংকট। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলমান মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা যাচাই করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে হবে।

জিআর ৫২/২০০৭ মামলা নিয়ে অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে দাউদকান্দি থানায় দায়ের করা জিআর ৫২/২০০৭ মামলাসহ তৎকালীন বিভিন্ন মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়।

তাঁদের অভিযোগ, ওই সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয় এবং গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের মাধ্যমে তাঁদের হয়রানি করা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকেও কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রতিটি মামলার প্রকৃতি আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মামলার দীর্ঘসূত্রতায় মৃত্যুর অভিযোগ

নেতাকর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিনের মামলা, আদালতে হাজিরা, গ্রেপ্তার-হয়রানির আশঙ্কা এবং মানসিক চাপের কারণে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তাঁরা জানান, গোয়ালমারী ইউনিয়ন বিএনপির তৎকালীন সভাপতি আবদুল হালিম ভূঁইয়া এবং সহসভাপতি মাজারুল ইসলাম বাদল দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মারা যান। তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে মামলাজনিত মানসিক চাপের সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি করেন স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা।

এ ছাড়া কালারকান্দি গ্রামের যুবদলকর্মী রেহান আলী পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে স্ট্রোকে মারা গেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

নাগেরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান তালুকদার, যিনি এলাকায় ‘চারু মাস্টার’ নামে পরিচিত ছিলেন, মিথ্যা মামলার মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে মারা যান বলেও দাবি তাঁদের। ওই মামলায় তাঁর দুই ছেলে পেয়ার হোসেন তালুকদার ও দিদার হোসেন তালুকদার এবং ছোট ভাই কবির হোসেন তালুকদারও আসামি ছিলেন বলে তাঁরা জানান।

জামানকে হত্যার অভিযোগ

জামালকান্দি গ্রামের জামান নামে এক ব্যক্তিকে তৎকালীন দাউদকান্দি থানার ওসি রফিক বাসা থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন—এমন গুরুতর অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।

তাঁদের দাবি, জামানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তবে জামানকে হত্যার অভিযোগটি গুরুতর হওয়ায় এর স্বাধীন তদন্ত, মামলা ও আদালতের নথির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা তাঁর পরিবারের বক্তব্যও প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

যাঁদের নাম উঠে এসেছে

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য ও অভিযোগে এসব মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে আরও যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, দাউদকান্দি বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান আহাম্মদ হোসেন তালুকদার;
  • মো. শাহাদাত হোসেন তালুকদার (সাকু);
  • এমারত হোসেন তালুকদার;
  • আক্তার হোসেন শিকদার;
  • গোয়ালমারী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মিজানুর রহমান প্রধান;
  • মরহুম কালাই মেম্বারের ছেলে মো. কাইয়ুম;
  • ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম;
  • শ্রমিকদল নেতা মোকলেস ও তাঁর ভাই সাইফুল;
  • স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা জাহিদ হোসেন;
  • জামালকান্দি গ্রামের শিল্পপতি ও বিএনপি নেতা শাহাবুদ্দিন;
  • একই পরিবারের আবদুস সালাম, নিজাম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন ও মাইনুদ্দিন;
  • উপজেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুজিবুর রহমান;
  • মফিজ উদ্দিনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের আরও বহু নেতাকর্মী।

ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে এসব মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে আসছেন।

মাসের পর মাস আদালতে হাজিরা, গুনতে হয়েছে লাখ লাখ টাকা

ভুক্তভোগীরা বলেন, প্রায় ১৮ বছর ধরে তাঁদের নিয়মিত কুমিল্লা দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। মামলার পেছনে আইনজীবীর খরচ, যাতায়াত, সময় এবং অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে অনেকের লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সন্তানদের লেখাপড়া ও পারিবারিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তাঁরা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও পুরোনো এসব মামলার কারণে তাঁরা এখনো হয়রানি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি।

বাদী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান বাবুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জামালকান্দি গ্রামের অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান বাবু এসব মামলার বাদী ছিলেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান বাবুর বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।

ক্ষতিপূরণ ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি

দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাসের বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়ের করা পুরোনো মামলাগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে যেসব মামলায় অভিযোগের ভিত্তি নেই, সেগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘ ১৮ বছর মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে যেসব পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তাঁরা।

তাঁদের আরও দাবি, রাজনৈতিক হয়রানি, বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুর অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভুক্তভোগীদের ভাষায়, “১৮ বছর ধরে মামলা ও আদালতের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আমরা আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন আমরা প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার চাই।”

By Sarker

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights