
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হিসেবে নয়, দেশের সব নাগরিককে নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানি বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্যের কারণ না হয়। দেশের সব নাগরিকের গর্বিত পরিচয়—তারা সবাই বাংলাদেশি।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু—এসব পরিচয় কোনো মুখ্য বিষয় নয়। অতএব, সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আসুন আমরা সবাই নিজেদের বাংলাদেশি ভাবি।’
তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানই একটি বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য। কেউ কাউকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে বিবেচনা করলে বিদেশ সফরের বিষয়টি মনে রাখা উচিত। কারণ ইউরোপ-আমেরিকায় গেলে আমরা সবাই সেখানে সংখ্যালঘু।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে মাঝেমধ্যে কংস চরিত্রের কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি করে তা জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
সমাজবিরোধী অপশক্তি যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যাতে বিরাজমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব।’
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ বিভিন্নভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকে দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। কোনো ধরনের বিদ্বেষ যাতে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি, সবসময় বলি এবং সবসময় বলব—প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এখন দেশ পুনর্গঠনের পালা।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল তার অন্যতম ব্রত। কংসের অত্যাচার ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ও জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতান্ত্রিক জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই কংসরূপী ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে।
সার্বভৌমত্ব সংহত এবং সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলাপের মাধ্যমে সবার কাঙ্ক্ষিত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার, আমার, আমাদের সকলের অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। এবং একই সঙ্গে বিএনপি ও বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে—ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারও সবার।’
আসন্ন দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব উৎসব শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপদ পরিবেশে পালনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানান এবং দুর্গোৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানান।
