• মে ১৯, ২০২৬

The Daily Shirso Aparadh

"ঠেকাও অপরাধ, বাঁচাও দেশ"

এলজিইডিতে লিফট চুরি নাকি বড় দুর্নীতির চক্র? উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

Byadmin

মার্চ ৩০, ২০২৬
এলজিইডিতে লিফট চুরি নাকি বড় দুর্নীতির চক্র? উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্যএলজিইডিতে লিফট চুরি নাকি বড় দুর্নীতির চক্র? উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এ চারটি দামি লিফট চুরির ঘটনা এখন আর সাধারণ কোনো চুরি হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে এটি একটি সুসংগঠিত দুর্নীতি চক্রের অংশ বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং নৈতিক অবক্ষয়ের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

পরিকল্পিতভাবে লিফট অপসারণের অভিযোগ

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ ও ২১ সেপ্টেম্বর এলজিইডির প্রধান ভবনের বেজমেন্ট থেকে জার্মান ব্র্যান্ড শিন্ডলারের চারটি লিফট সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটি লিফটের ধারণক্ষমতা ছিল ১৮ থেকে ২০ জন।

অভিযোগ অনুযায়ী, আটটি ট্রাক ব্যবহার করে এই অপারেশন সম্পন্ন করা হয়, যা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ও সংগঠিত কর্মকাণ্ড হিসেবে নির্দেশ করে।

এই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম এসেছে—

  • নির্বাহী প্রকৌশলী (যন্ত্রকৌশল) মো. আতাউর রহমান
  • সহকারী প্রকৌশলী শিমুল দেবনাথ
  • সহকারী প্রকৌশলী আল হেলাল মো. আসাদ

অভিযোগ রয়েছে, লিফটগুলো প্রায় ৩৮ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয় এবং এর মধ্যে বড় একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়।

‘মৌখিক নির্দেশে’ বিক্রির বিতর্ক

ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আলী আকতার হোসেনের নামও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার ‘মৌখিক নির্দেশে’ লিফট বিক্রি করা হয়। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে অভ্যন্তরীণ সূত্র বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করছে না।

সিসিটিভি বন্ধ রেখে প্রমাণ গোপনের চেষ্টা

লিফট অপসারণের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে—

  • ২০২৪ সালের ২ অক্টোবরের পর আবারও সিসিটিভি বন্ধ করা হয়
  • কিছু যন্ত্রাংশ ফেরত এনে ঘটনাকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়

এসব পদক্ষেপকে প্রমাণ নষ্ট করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ সংগঠনের উদ্যোগ
  • সিসিটিভির পাসওয়ার্ড পরিবর্তন
  • ঘটনাস্থলে যন্ত্রাংশ এনে নাটকীয়তা সৃষ্টি
  • তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করার চেষ্টা

এসব কর্মকাণ্ড তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিয়োগ বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

এলজিইডির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছে। বলা হচ্ছে—

  • মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক কর্মচারী নিয়মিত অফিসে না এসেও বেতন নিচ্ছেন
  • এসব কর্মচারীর কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে
  • কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও উঠেছে

৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে একটি কক্ষে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।

সরকারি সম্পদের অপব্যবহার

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ নিয়মিত সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজের বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অবস্থান পরিবর্তন

সূত্র বলছে, এই চক্রটি এলজিইডির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। নতুন কোনো প্রধান প্রকৌশলী যোগ দিলেই তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।

এছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদলের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে, যা বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। একই বছরের ২১ জুলাই থেকে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ তদন্তের নির্দেশ দিলেও কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি।

আইনি দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • এটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ
  • তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের দায়িত্বে বহাল রাখা তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে
  • অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে

জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি

চারটি লিফট চুরির ঘটনা এখন একটি বৃহৎ দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—

  • অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত
  • স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন
  • সম্পদের হিসাব যাচাই

সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম অব্যাহত থাকলে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এলজিইডির এই ঘটনা শুধু একটি চুরির ঘটনা নয়, বরং একটি বড় দুর্নীতি চক্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Verified by MonsterInsights