
মাহমুদুল হাসান :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে যাচ্ছেন—এমন বাস্তবতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ, নতুন প্রত্যাশা।
১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত—মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রায় দুই বছর বাদ দিলে—বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে দুই নারী নেতা, বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ এই সময়কে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিহিত করেছেন ‘দুই নেত্রী’র যুগ’ হিসেবে।
🗳️ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট: গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক শূন্যতা:২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অবস্থান নেয়া। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। অন্যদিকে, গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যু কার্যত ‘দুই নেত্রী’র যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটায়।
এই দুই ঘটনার পর দেশের রাজনীতি প্রবেশ করে এক নতুন বাস্তবতায়—যেখানে নেতৃত্বের কেন্দ্রে আর কোনো নারী নেই।
✨ সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী: তারেক রহমান আলোচনায়
এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন পুরুষ রাজনীতিকরা। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি জয়ী হলে তিনিই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছে। এ জোট থেকেও পুরুষ নেতৃত্বই সরকারপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
📜 ইতিহাসের পাতা উল্টে
বাংলাদেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০)। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের প্রধানমন্ত্রীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা:
তাজউদ্দীন আহমদ (১৯৭১-১৯৭২)
শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২-১৯৭৫)
মুহাম্মদ মনসুর আলী (১৯৭৫)
শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯-১৯৮২)
আতাউর রহমান খান (১৯৮৪-১৯৮৫)
মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬-১৯৮৮)
মওদুদ আহমদ (১৯৮৮-১৯৮৯)
কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০)
খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬, ২০০১-২০০৬)
শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০২৪)
সেই হিসাবে প্রায় ৩৬ বছর পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন—যা সংসদীয় ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
⚖️ গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা
২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার’, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘রাতের ভোটের’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ‘ডামি ভোটের’ নির্বাচন—এমন সমালোচনা রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা পুনর্গঠনের এক বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন,
“গত তিন দশকে নারী নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই বাস্তবতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার।”
🌅 নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় দেশ
স্বাধীনতার পর থেকে বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী বাংলাদেশ। তবে ‘দুই নেত্রী’র যুগ’ ছিল দীর্ঘতম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করতে যাচ্ছে।এখন প্রশ্ন একটাই—
নতুন নেতৃত্ব কি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সহাবস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারবে? পুরো দেশ এখন তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রুয়ারির ফলাফলের দিকে।
বাংলাদেশ কি প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক যুগে? সময়ই দেবে তার উত্তর।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/