
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা:
উচ্চশিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা আর প্রাচুর্য যে অনেক সময় মানবিকতা ও পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখতে পারে না, তার এক নির্মম উদাহরণ তৈরি হলো রাজধানীর মিরপুরে। মিরপুর সেকশন-৬ এর একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭২) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে নিজ বিছানাতেই তার মৃত্যু হয়েছিল।
গত রবিবার (১ জুন) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ স্থানীয়দের দেওয়া কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। তবে এই মৃত্যুর চেয়েও বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে বৃদ্ধার সন্তানদের চরম উদাসীনতা ও ঘরের ভেতরের হাড়হিম করা পরিবেশ।
তদন্তে জানা গেছে, মিরপুর-৬ এর সি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাসার ওই ফ্ল্যাটটি মূলত ওই বৃদ্ধার মেয়ের। সেখানে মা ও মেয়ে ছাড়া আর কোনো পুরুষ সদস্য থাকতেন না। ফ্ল্যাটের এক কক্ষে মা এবং অন্য কক্ষে মেয়ে থাকতেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মা এক সপ্তাহ আগে মারা গেলেও পাশের কক্ষে থাকা মেয়ে তার কোনো খোঁজ নেননি। রবিবার দীর্ঘ দিন পর মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মেয়ে ভাবেন মা হয়তো অসুস্থ। এরপর তিনি নিজে ঘরে না ঢুকে একজন নার্সকে ডেকে আনেন। ওই নার্স ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখতে পান, বৃদ্ধার দেহে মরণপচন ধরে মাংস বিছানায় খসে পড়েছে। নার্সের চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসে এবং পুলিশে খবর দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃদ্ধা যে কক্ষটিতে থাকতেন, তার অবস্থা ছিল মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। পুরো ঘর ময়লা-আবর্জনা, ছত্রাক ও পোকা-মাকড়ে ভরে ছিল। দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই বৃদ্ধাকে কোনো প্রকার পরিচর্যা করা হয়নি এবং কেউ ওই ঘরে প্রবেশও করেনি।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বশির জানান, বৃদ্ধার মেয়ের আচরণ ও মানসিক অবস্থা কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তিনি বলেন,
"মা ঘরে মরে পচে গেলেন, অথচ পাশের ঘরে থেকেও মেয়ে নাকে কোনো গন্ধ পাননি—এই বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।"
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৃত নুরজাহান বেগমের এক ছেলে মোংলা স্থলবন্দরের সচিব পদে কর্মরত এবং আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। এছাড়া তার মেয়ের প্রয়াত স্বামীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
সমাজে এতটা উচ্চপ্রতিষ্ঠিত পরিবার হওয়া সত্ত্বেও বৃদ্ধার শেষ জীবন কেটেছে চরম অবহেলায়। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েট শিক্ষক ছেলে ঘটনাস্থলে ছুটে এলেও, মোংলা স্থলবন্দরের সচিব পদে থাকা অন্য ছেলেটি আসেননি বলে জানা গেছে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি স্থানীয় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। আধুনিক সমাজে পারিবারিক বন্ধনের এই চরম বিপর্যয় নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু ডায়েরি করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পল্লবী থানা পুলিশ।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/