
সোহেল রানা
ঢাকা নগরীর দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা টমটম। নিয়ন্ত্রণহীন সংখ্যা বৃদ্ধি, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক ও অবৈধ চলাচলের কারণে এই যান এখন নগরবাসীর কাছে প্রকৃত অর্থেই এক ‘গলার কাঁটা’তে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন রাজধানীর সড়কে যানজট, দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত ভাড়ার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি
অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এখন নগর জীবনের জন্য এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। নিম্নমানের ব্রেকিং সিস্টেম, ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং প্রশিক্ষণহীন চালকের কারণে প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বাড়ছে প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনা। পথচারী থেকে শুরু করে অন্যান্য যানবাহনের চালকরাও পড়ছেন চরম ঝুঁকিতে।
ভোগান্তির প্রধান কারণসমূহ :
১. যানজট ও দুর্ঘটনা:
অনিয়ন্ত্রিত গতি ও দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থার কারণে অটোরিকশাগুলো প্রায়শই সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা ও যানজট।
২. অবৈধ চলাচল:
বৈধ অনুমোদনের চেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকার রাস্তায় চলাচল করছে, যা ট্রাফিক ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দিচ্ছে।
৩. অতিরিক্ত ভাড়া আদায়:
মিটার অনুসরণ না করে ইচ্ছামতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
৪. অকার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা:
‘রিকশা ট্র্যাপার’-এর মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। চালকেরা এসব নিয়ম মানছেন না।
নিরাপত্তা ও অপরাধ ঝুঁকি,শুধু দুর্ঘটনাই নয়, এই যানবাহন ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নগরীর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাস্তায় দখলদারির কারণে পথচারীদের চলাচলও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ খাতেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। নিম্নমানের লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিটি যান ৪ –৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন অন্তত ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। অবৈধ সংযোগে চার্জ নেওয়ায় বাড়ছে লোডশেডিং, ভোগান্তিতে পড়ছেন বৈধ গ্রাহকরা।
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মত বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব যানের নকশা দুর্বল, কোনো নিরাপত্তা মানদণ্ড নেই—ফলে সামান্য ধাক্কাতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।
আয়–বাস্তবতা ও সামাজিক ভ্রান্ত ধারণা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করেন, যা বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। অথচ তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় না ইনকাম ট্যাক্স, রোড ট্যাক্স কিংবা রেজিস্ট্রেশন ফি। দেশের গড় আয়ের চেয়ে বেশি আয় করলেও সামাজিকভাবে তারা এখনো ‘গরিব’ হিসেবে চিহ্নিত—এটি এক বড় ভ্রান্ত ধারণা।
নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি,নগরবাসীর অভিযোগ, এসব যানচালকেরা উল্টোপথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র দাঁড়ানো, সিগন্যাল ভাঙা ও লাইসেন্স ছাড়াই রাস্তায় নামার মতো নিয়মভঙ্গ করে চলেছেন। এর ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা, কেউ হচ্ছেন পঙ্গু, কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ।
পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সমন্বিত ও কঠোর নীতি প্রণয়ন না করলে ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়তে পারে। তাই— নগর ও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল সীমিত করা,বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা
নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ,অবৈধ যান ও ব্যাটারি উৎপাদন–আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ,এসব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন আর শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়—এটি জননিরাপত্তা, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য এক ভয়ংকর হুমকি। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মাশুল দিতে হবে পুরো নগরবাসীকেই। এখনই সিদ্ধান্তমূলক ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/