
একরামুল হক:
বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের বিস্তার দিন দিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা ফলমূল, মাছ, মাংস, দুধ, মসলা, মিষ্টি, তেল এমনকি শিশু খাদ্যেও বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকটে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে কার্বাইড, ফরমালিন, টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহৃত বিষাক্ত রং, ডিটারজেন্ট, কৃত্রিম সুগন্ধি ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করছে। ফল দ্রুত পাকানো, মাছ ও মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, মিষ্টির রং উজ্জ্বল করা কিংবা দুধের ঘনত্ব বাড়ানোর নামে এসব ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হচ্ছে। এসব রাসায়নিক দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে, যার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভারের জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হরমোনজনিত সমস্যা, স্নায়ুরোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেজাল খাদ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—অধিকাংশ ভোক্তাই বুঝতে পারেন না যে তারা প্রতিদিন বিষাক্ত উপাদানযুক্ত খাবার গ্রহণ করছেন। এ কারণেই ভেজাল খাদ্যকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতির কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিও নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়ছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, বরং একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকট হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আইন ও নীতিমালা থাকলেও তার কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অসাধু ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধের প্রবণতা কমছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার তদারকি, আধুনিক পরীক্ষাগারভিত্তিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার কঠোর নজরদারি এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ খাদ্য নির্বাচন, সন্দেহজনক পণ্য বর্জন এবং খাদ্যে ভেজাল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। পাশাপাশি পরিবার থেকেই শিশুদের স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
ভেজাল খাদ্যের ভয়াবহ বিস্তার আজ দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/