
পর্ব-২
সোহেল রানা:
দুর্নীতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, মানিলন্ডারিং থেকে শুরু করে গণহত্যার অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ মামলার আসামি হয়েও বেপরোয়া গতিতে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম। রাজনৈতিক প্রভাব, উচ্চপর্যায়ের তদবির ও আমলাতান্ত্রিক ছত্রছায়ায় থেকে তিনি শুধু পার পেয়ে নয়—বরং কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছেন।
৪৮ জেলার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম
‘দেশের ৪৮ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ’ প্রকল্পটি সরকারে অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠান ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড, সহযোগিতায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—
দুই দফায় ৪৮ কোটি টাকা বিল মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। অভিযোগ ওঠে, কাজ না করেই বিল উত্তোলন, প্রকল্পের টাকা বাটপারি ও ভাগবাটোয়ারা। বেকারত্ব কমানোর স্বপ্নের প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অর্থলুটের খাতে।
একজন ভুক্তভোগী জানান—
“কোটি তরুণের স্বপ্ন ছিল ফ্রিল্যান্সিং শেখার। কিন্তু মাসুদ আলমের মতো অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রকল্প দেওয়ায় বেকারত্ব কমেনি, শুধু পকেট ভারী হয়েছে কিছু ক্ষমতাবানের।”
জিরো থেকে হিরো—কার ছত্রছায়ায় বড়লোক মাসুদ?
মাসুদ আলমকে সচিব মেজবাহ উদ্দিনের ‘পালিত ছেলে’ হিসেবে পরিচিত। এই সাবেক সচিবের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি বহু তদন্ত থেকে পার পেয়ে যান। মেজবাহ উদ্দিন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার প্রভাব ছিল এতটাই যে, সিআইডির অনুসন্ধান থেকেও বাদ পড়েন মাসুদ।
অভিযোগ আরও আছে—
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে ম্যানেজ করেই মাসুদ নতুন মোড়কে পুরনো প্রতারণার পেশায় ফিরে আসেন। প্রকল্পের টাকার ভাগ প্রকল্প পরিচালক: ২০%, মহাপরিচালক: ১০%
ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারি: নেপথ্যের ‘মাস্টারমাইন্ড’
২০২১-২২ সালে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জ ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচনায় আসে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সোনিয়া ও তার ভাই সোহেল গ্রেপ্তার হন, কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকেন মূল হোতা মাসুদ আলম।
ই-অরেঞ্জে তিনি ছিলেন জেনারেল ম্যানেজার
অধিকাংশ টাকা নিজের সিন্ডিকেটে পাচার করেন, পরে এক সচিবের তদবিরে পার পেয়ে যান
এর আগেও “ক্লিক দ্য ফটো” নামের প্রতারণামূলক ফ্রিল্যান্সিং স্কিমে ১১৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১০০ কোটি টাকা সরানো!
দুদক ও বিএফআইইউর ফ্রিজ করা হিসাব থেকে মাসুদ আলম কৌশলে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেন—যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে ভয়াবহ নজির। উত্তোলিত অর্থের বড় অংশ সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল
সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিন এর কাছে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় সিআর মামলা নং ৪৯৯/২০২৫ দায়ের হয়েছে। ৩০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পও তারই!
বিতর্ক, মামলা, দুর্নীতি—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ৩০০ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পও পেয়েছে মাসুদের প্রতিষ্ঠান। আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“গুণগত মানহীন প্রতিষ্ঠানকে এত বড় প্রকল্প দেওয়া রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।”
অভিযোগ আছে—
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার তৎকালীন এপিএসকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ,,প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ খানের বিরুদ্ধেও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ
৭০ মামলা—গণহত্যা থেকে শুরু করে সরকারি সম্পদ ধ্বংস পর্যন্ত
গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় মাসুদ আলমের নামে উসকানি, হত্যা ও সহিংসতার ৭০টি মামলা হয়। এমনকি গণহত্যার অভিযোগেও তার নাম রয়েছে।
তবুও তিনি নতুন সরকারের আমলেও আরামে প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছিলেন—যা প্রশাসনে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রমিস গ্রুপ: ১৫ কোম্পানির প্রতারণা সিন্ডিকেট
মাসুদ আলমের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য—
নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড (এমএলএম কেলেঙ্কারি)
প্রমিস মার্ট
প্রমিস অ্যাসেট
প্রমিস টেক
ইত্যাদি মিলিয়ে ১৫টি কোম্পানি।
২০২৪ সালে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার সময় হলফনামায় সম্পদ দেখান ৯.৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু দুদক বলছে—প্রকৃত সম্পদ এর কয়েকগুণ বেশি।
বিস্ময়কর সম্পদ—দেশে ও বিদেশে
দুদকের অনুসন্ধানে যা জানা গেছে—
দুবাইতে তার ভাইয়ের নামে হোটেল ক্রয়
থাইল্যান্ডে রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ
রাজধানীর কল্যাণপুরে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে খাজা টাওয়ারে ৭২ হাজার স্কয়ারফুট অফিস
ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট-বাড়ি, দামি গাড়ি
শরীয়তপুরে মার্কেট নির্মাণ
যুব উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা লুট
দুদকের পদক্ষেপ
মাসুদ আলম ও তার স্ত্রীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি
প্রমিস গ্রুপ কর্মকর্তাদের নজরদারি
ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ
অফিস কার্যক্রম স্থবির
ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের অফিসে গিয়ে দেখা যায়—
সব অফিস নম্বর বন্ধ
কার্যক্রম স্থবির
কর্মীরা অনুপস্থিত
আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে—
“এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগেই ভুয়া বিল ভাউচার, নিম্নমানের প্রশিক্ষণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। এত বিতর্কের পরও প্রকল্প দেওয়া—রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার প্রতি বড় হুমকি।”
পর্ব–২ সমাপ্ত | পর্ব–৩ শিগগিরই প্রকাশিত হবে
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/