
মাহাবুবুল হক:
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১৪ মার্চ) সকাল ১০টায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির সূচনা করেন। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের আওতায় ইসলাম ধর্মের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের পুরোহিত, সেবায়েত, বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদেরও মাসিক সম্মানী প্রদান করা হবে।
ধর্মীয় নেতাদের সামাজিক ভূমিকার প্রশংসা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে এমন সব মানুষ একত্রিত হয়েছেন যাদের সমাজের মানুষ কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই সম্মান করে। জীবনের কঠিন ও সংকটময় মুহূর্তে মানুষ প্রায়ই তাদের কাছে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করে।
তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানে যেমন ইসলাম ধর্মের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনরা উপস্থিত রয়েছেন, তেমনি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের পুরোহিত, সেবায়েত এবং বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষরাও উপস্থিত আছেন। এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যের প্রতিফলন।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার ধাপে ধাপে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের সহায়তা দেওয়া এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।
তিনি জানান, নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি দেশের সব অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হবে।
এছাড়া কৃষকদের সহায়তা দিতে আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ থেকে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে। একই সঙ্গে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হবে বলেও তিনি জানান।
নাগরিকের ক্ষমতায়ন ছাড়া রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তার ভাষায়, “নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।”
তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে।
মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে, কিন্তু একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতা, সহনশীলতা, উদারতা ও মানবিকতা—এই গুণগুলো ছাড়া প্রকৃত অর্থে একটি সভ্য সমাজ গড়ে ওঠে না।
তিনি বলেন, এসব মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ধর্মীয় নেতারা সমাজে এই শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
পবিত্র হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই এবং যার কাছে মানুষ নিরাপত্তা পায় না, সে প্রকৃত অর্থে ইমানদার নয়। একইভাবে যার ওয়াদা ঠিক নেই, তার কোনো ধর্মই নেই।
সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে ধর্মের ভূমিকা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিহিংসা ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে ধর্মের মানবিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্ম মানুষকে সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়।
তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদগুলোকে ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়াও সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার বড় সুযোগ রয়েছে।
অতীতের উদ্যোগের স্মরণ
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর সময় চালু হওয়া ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’র কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সরকারের সময় ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল, যা সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারও ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী প্রদানের পাশাপাশি তাদের দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে।
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার ধর্মীয় নেতা সম্মানী পাচ্ছেন
প্রধানমন্ত্রী জানান, এই কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহারের মোট ১৬ হাজার ৯৯২ জন ধর্মীয় নেতা মাসিক সম্মানী পাচ্ছেন।
পর্যায়ক্রমে দেশের সব ধর্মীয় নেতাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
আইনশৃঙ্খলা বৈঠকেও ধর্মীয় প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বৈঠকে একজন ইমাম, খতিব অথবা অন্য কোনো ধর্মীয় প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে নৈতিকতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা আরও কার্যকর হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান—সবাই মিলে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
তিনি বলেন, কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ, মানবিক ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
প্রধান সম্পাদক : মো. আবদুল লতিফ জনি, সম্পাদক ও প্রকাশক : মাহাবুবুল হক, বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়: ১৭৭, মাহতাব সেন্টার, ৮ম তলা, বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, ঢাকা -১০০০। ফোন নাম্বার: +৮৮০২৯৬৯৭৪৮৮৮৯, ই-মেইল: editor.dso@gmail.com, ওয়েবসাইট: https://shirsoaparadh.com/